রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে অভিষেকটা মার্ক কুকুরেয়ার জন্য আনন্দের হওয়ার কথা থাকলেও জার্মানির মাটিতে সেই অভিষেকের সঙ্গে যুক্ত হলো দুয়োধ্বনি। দুই বছর আগে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে জার্মানি-স্পেন কোয়ার্টার ফাইনালের বিতর্কিত হ্যান্ডবলের ঘটনার রেশ এখনো যে জার্মান সমর্থকদের মধ্যে রয়ে গেছে, কুকুরেয়ার অভিষেকেই সেটি আবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত রবিবার (১৬ জুন) জার্মানির গেলজেনকির্শেনের ভেল্টিন্স অ্যারেনায় শালকের বিপক্ষে প্রাক্-মৌসুম ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে প্রথমবার মাঠে নামেন ২৮ বছর বয়সী স্প্যানিশ লেফট-ব্যাক মার্ক কুকুরেয়া। ম্যাচের ৬১ মিনিটে আলভারো কারেরাসের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন তিনি।
ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদ ৩-০ গোলের জয় পায়। কিন্তু কুকুরেয়া মাঠে নামার পর থেকেই গ্যালারির একাংশ থেকে দুয়োধ্বনি শোনা যায়। তিনি যখনই বলের নিয়ন্ত্রণ নেন, তখনও সেই দুয়ো চলতে থাকে।
কুকুরেয়ার প্রতি জার্মান সমর্থকদের ক্ষোভের মূল কারণ ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের কোয়ার্টার ফাইনাল। সেবার জার্মানি ও স্পেন মুখোমুখি হয়েছিল।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জার্মানির জামাল মুসিয়ালার নেওয়া শট কুকুরেয়ার হাতে লাগে। জার্মান খেলোয়াড় ও সমর্থকদের দাবি ছিল, ঘটনাটি পেনাল্টির যোগ্য। কিন্তু ম্যাচের রেফারি অ্যান্থনি টেলর পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেননি।
সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ম্যাচের পর ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। জার্মানির সমর্থকদের বড় একটি অংশ মনে করেছিল, ওই ঘটনায় তাদের পেনাল্টি পাওয়া উচিত ছিল।
শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে জার্মানিকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে স্পেন। পরে সেই আসরের চ্যাম্পিয়নও হয় স্পেন।
ঘটনাটি পরবর্তী সময়েও আলোচনায় ছিল। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার পক্ষ থেকেও পরে বলা হয়, ওই ঘটনায় জার্মানিকে পেনাল্টি দেওয়া উচিত ছিল।
ফলে কুকুরেয়ার হাতে বল লাগার ঘটনাটি জার্মান ফুটবল সমর্থকদের কাছে আরও বেশি আলোচিত হয়ে ওঠে। এমনকি ম্যাচটি পুনরায় আয়োজনের দাবিতে অনলাইন পিটিশনও করা হয়েছিল।
ওই পিটিশনে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউরো ২০২৪-এর পরও জার্মানিতে খেলতে গিয়ে কুকুরেয়াকে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
ইউরোর সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচেও নিরপেক্ষ দর্শকদের কাছ থেকে দুয়ো শুনেছিলেন তিনি। এরপর গত বছর মিউনিখে পর্তুগালের বিপক্ষে উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালেও একই অভিজ্ঞতা হয়।
শুধু জাতীয় দলের ম্যাচেই নয়, ক্লাব ফুটবলেও তাকে জার্মান সমর্থকদের দুয়োর মুখে পড়তে হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে চ্যাম্পিয়নস লিগে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে চেলসির ম্যাচেও কুকুরেয়াকে দুয়ো শুনতে হয়েছিল।
অর্থাৎ ২০২৪ ইউরোর সেই ঘটনার দুই বছর পরও জার্মানিতে কুকুরেয়ার নাম উঠলেই ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় চলে আসে।
তবে জার্মান সমর্থকদের দুয়ো নিয়ে খুব বেশি ভাবতে চান না কুকুরেয়া। বরং রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে প্রথমবার মাঠে নামতে পেরে তিনি নিজের আনন্দের কথাই জানিয়েছেন।
অভিষেকের পর কুকুরেয়া বলেন, তিনি খুব খুশি। রিয়ালের মতো ক্লাবের হয়ে খেলতে পারা তার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তার ভাষায়, বছরের পর বছর করা পরিশ্রমের পর রিয়ালের জার্সিতে মাঠে নামার সুযোগ পাওয়া তার জন্য বিশেষ অনুভূতি। সামনে আরও শিরোপা জয়ের প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।
দুয়ো নিয়ে এর আগে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছিলেন কুকুরেয়া। তিনি বলেছিলেন, প্রথমবার বিষয়টি বুঝতে পারেন যখন ম্যাচের আগে তার নাম ঘোষণা করা হয়েছিল এবং তখন অনেক দর্শক শিস দিচ্ছিল।
প্রথমে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও পরে তিনি উপলব্ধি করেন, ২০২৪ ইউরোর সেই হ্যান্ডবলের ঘটনার কারণেই জার্মান দর্শকদের একটি অংশ তার প্রতি বিরূপ আচরণ করছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে তিনি খুব বেশি ভাবেননি। একই সঙ্গে তিনি এটাও জানিয়েছিলেন যে, কিছুটা খারাপ লেগেছিল। কারণ একজন খেলোয়াড়কে দুয়ো দেওয়ার জন্য মানুষ ম্যাচ দেখতে এসেছে—এমন পরিস্থিতি তার কাছে অস্বস্তিকর মনে হয়েছিল।
কুকুরেয়ার রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার ঘটনাটিও ছিল বড় ধরনের চমক। বিশ্বকাপের মাঝপথে ইউরোপের অন্যতম সফল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ তাকে নিজেদের খেলোয়াড় হিসেবে ঘোষণা করে।
চেলসি থেকে প্রায় ৬ কোটি ইউরো, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে তাকে দলে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিয়ালে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে কুকুরেয়ার দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। শৈশব থেকেই এই ক্লাবের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে প্রথম ম্যাচে মাঠে নামার সুযোগ পাওয়াকে কুকুরেয়ার ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও অভিষেক ম্যাচেই জার্মান সমর্থকদের দুয়ো শুনতে হয়েছে তাকে, তবুও মাঠের পারফরম্যান্স ও ভবিষ্যৎ সাফল্যের দিকেই মনোযোগ দিতে চান তিনি।
শালকের বিপক্ষে রিয়ালের ৩-০ ব্যবধানের জয়ও তার অভিষেককে ইতিবাচকভাবে শুরু করার সুযোগ দিয়েছে। এখন কুকুরেয়ার সামনে লক্ষ্য হবে রিয়ালের হয়ে নিয়মিত জায়গা করে নেওয়া এবং ক্লাবটির হয়ে শিরোপা জয়ে অবদান রাখা।
পুরোনো ইউরো বিতর্ক তার পেছনে কতদিন থাকবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে রিয়ালের জার্সিতে নতুন অধ্যায়ে কুকুরেয়ার লক্ষ্য যে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই নিজের পরিচয় তৈরি করা, তার বক্তব্যে সেটিই স্পষ্ট।



























