দীর্ঘ ২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পরিবারের কাছে ফিরছেন কক্সবাজারের উখিয়ার মোহাম্মদ ফরিদ। মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে বিদেশে পাড়ি জমানোর পর মানবপাচারের শিকার হয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার। দুই যুগেরও বেশি সময় পর দেশে ফিরে মায়ের কোলে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে তার।
ফরিদের দেশে ফেরার খবরে কক্সবাজারের উখিয়ায় তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বৃদ্ধা মা নূরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে ছেলের অপেক্ষায় ছিলেন। পরিবার জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে ফরিদকে তার স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
জানা গেছে, ফরিদের ভাই সৈয়দ আলম তাকে গ্রহণ করতে কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। রাতের বাসে যাত্রা করে তিনি বৃহস্পতিবার ভোরে ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে পৌঁছাবেন। সেখানে ব্র্যাক ও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ফরিদের পরিবারের কাছে হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫ বছর আগে মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবা আয়ুব আলীর সঙ্গে পাকিস্তানে যান ফরিদ। সেখানে গিয়ে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে আহত হয়ে তিনি পা হারান। শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যেই পরবর্তী সময়ে দালালচক্রের মাধ্যমে তাকে তুরস্কে পাচার করা হয়।
তুরস্কে যাওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে ফরিদের যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় তার কোনো খোঁজ না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা ধরে নিয়েছিলেন, হয়তো তিনি আর বেঁচে নেই। এভাবেই বছরের পর বছর কেটে যায়। কিন্তু পরিবারের সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ফরিদের দেশে ফেরার পথ তৈরি হয়।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ভোর সোয়া ৫টার দিকে টার্কিশ এয়ারলাইনসের টিকে-৭১২ ফ্লাইটে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফরিদ। দেশে পা রাখার পর তার পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ফরিদের ভাই সৈয়দ আলম জানান, তাদের বাবা আয়ুব আলী এখনো পাকিস্তানে অবস্থান করছেন। চার ভাই-বোনের মধ্যে ফরিদ সবার বড়। ছোট বয়সে বাবার সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার পর ফরিদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘদিন কোনো খবর না থাকায় পরিবারের সদস্যরা তার ফিরে আসার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন।
২৫ বছর পর বড় ভাইকে ফিরে পাওয়ার খবরে উখিয়ার বাড়িতে এখন আবেগঘন পরিবেশ বিরাজ করছে। বৃদ্ধা মা নূরজাহান বেগমের দীর্ঘ অপেক্ষাও শেষ হতে যাচ্ছে। ছেলেকে আবার সামনে থেকে দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
ফরিদের ঘটনা দীর্ঘদিন বিদেশে নিখোঁজ থাকা এবং মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দুর্ভোগের একটি করুণ উদাহরণ। ছোট বয়সে বিদেশে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া, এরপর পাচার হয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া—সব মিলিয়ে তার জীবনের গত ২৫ বছর কেটেছে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে।
তবে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে ফরিদের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার পরিবারের সদস্যদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে তুলে দেওয়ার পর দীর্ঘ ২৫ বছর পর মায়ের সঙ্গে তার দেখা হওয়ার কথা।


























