ঢাকা ১১:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ সংকটে মার্কিন শক্তির বড় সীমাবদ্ধতা

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৯:১৩:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫১৪

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বাড়ছে উত্তেজনা। | ছবি: সংগৃহীত

হরমুজ সংকট ছয় মাস পেরিয়েও শেষ হয়নি। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১১০টি জাহাজ যে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচল করত, সেই হরমুজ প্রণালি এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার বড় উদ্বেগের কারণ। সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হলেও এই সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেই প্রতিটি রাজনৈতিক লক্ষ্য সহজে অর্জন করা যায় না।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সংঘাত শুরু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের প্রাথমিক হিসাব ছিল, ব্যাপক সামরিক চাপ তৈরি করলে তেহরান দ্রুত নতি স্বীকার করবে। কিন্তু কয়েক মাস পরও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং ইরান হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফলে হরমুজ সংকট এখন শুধু দুই দেশের সামরিক সংঘাতের বিষয় নয়, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও।

সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে একটি টাগবোট ডুবে যাওয়া এবং প্রায় এক ডজন নাবিক নিহত বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়িয়েছে। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করত। ফলে প্রণালিটি দীর্ঘ সময় অচল থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়া স্বাভাবিক। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা তাদের মিত্রদের জাহাজকে হুমকি দেওয়ার পর সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এরপর দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় পালটা হামলা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ও ড্রোন স্থাপনায় আঘাত হানে। অন্যদিকে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলা এবং সমুদ্রপথে মাইন ব্যবহারের মতো কৌশল নেয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কূটনৈতিক উদ্যোগও বারবার সফল হয়নি। ফলে কখনো অবরোধ কঠোর হয়েছে, কখনো কিছুটা শিথিল হয়েছে, আবার নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হলেও তেহরান এখনো নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

এদিকে দীর্ঘ সংঘাতের প্রভাব মার্কিন নৌবাহিনীর সদস্যদের ওপরও পড়ছে। বিভিন্ন মার্কিন সামরিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের কিছু নাবিক টানা ২৫০ দিনের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন জাহাজে অবস্থানের কারণে খাবার, পানি, থাকার পরিবেশ এবং মানসিক চাপ নিয়ে অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব তথ্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় প্রমাণ করে না। তবে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সামরিক বাহিনীর ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে, তা স্পষ্ট করে। একই সঙ্গে যুদ্ধের শেষ কোথায় এবং কতদিন পর সমাধান আসবে, সেই প্রশ্নও বড় হয়ে উঠছে।

ইরানও এই পরিস্থিতিকে কৌশলগত সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে তেহরান নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং জব্দ সম্পদ মুক্ত করার মতো কঠোর দাবি তুলেছে। আন্তর্জাতিকভাবে এসব দাবির বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এগুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরান এখনো আলোচনার টেবিলে দুর্বল অবস্থানে নেই। বরং তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে।

হরমুজ সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কৌশলে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখছে, অন্যদিকে চীন ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উপসাগরীয় অঞ্চল, ইরান, চীন ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে ইসলামাবাদ একই সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগের পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করাও সেই পরিবর্তিত কৌশলের অংশ।

সব মিলিয়ে হরমুজ সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা কোনো দেশের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতকে নিজের শর্তে শেষ করা সহজ নয়। অবকাঠামো ধ্বংস করা সম্ভব হলেও রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করতে প্রয়োজন কূটনীতি, সমঝোতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান অচলাবস্থা তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্ব নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ সংকটে মার্কিন শক্তির বড় সীমাবদ্ধতা

Update Time : ০৯:১৩:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

হরমুজ সংকট ছয় মাস পেরিয়েও শেষ হয়নি। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১১০টি জাহাজ যে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচল করত, সেই হরমুজ প্রণালি এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার বড় উদ্বেগের কারণ। সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হলেও এই সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেই প্রতিটি রাজনৈতিক লক্ষ্য সহজে অর্জন করা যায় না।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সংঘাত শুরু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের প্রাথমিক হিসাব ছিল, ব্যাপক সামরিক চাপ তৈরি করলে তেহরান দ্রুত নতি স্বীকার করবে। কিন্তু কয়েক মাস পরও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং ইরান হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফলে হরমুজ সংকট এখন শুধু দুই দেশের সামরিক সংঘাতের বিষয় নয়, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও।

সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে একটি টাগবোট ডুবে যাওয়া এবং প্রায় এক ডজন নাবিক নিহত বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়িয়েছে। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করত। ফলে প্রণালিটি দীর্ঘ সময় অচল থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়া স্বাভাবিক। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা তাদের মিত্রদের জাহাজকে হুমকি দেওয়ার পর সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন  ইরানের ১০ দফা শর্তে কি থামছে যুদ্ধ? যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন ট্রাম্প

এরপর দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় পালটা হামলা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ও ড্রোন স্থাপনায় আঘাত হানে। অন্যদিকে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলা এবং সমুদ্রপথে মাইন ব্যবহারের মতো কৌশল নেয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কূটনৈতিক উদ্যোগও বারবার সফল হয়নি। ফলে কখনো অবরোধ কঠোর হয়েছে, কখনো কিছুটা শিথিল হয়েছে, আবার নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হলেও তেহরান এখনো নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

এদিকে দীর্ঘ সংঘাতের প্রভাব মার্কিন নৌবাহিনীর সদস্যদের ওপরও পড়ছে। বিভিন্ন মার্কিন সামরিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের কিছু নাবিক টানা ২৫০ দিনের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন জাহাজে অবস্থানের কারণে খাবার, পানি, থাকার পরিবেশ এবং মানসিক চাপ নিয়ে অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব তথ্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় প্রমাণ করে না। তবে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সামরিক বাহিনীর ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে, তা স্পষ্ট করে। একই সঙ্গে যুদ্ধের শেষ কোথায় এবং কতদিন পর সমাধান আসবে, সেই প্রশ্নও বড় হয়ে উঠছে।

আরও পড়ুন  এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের টানাপোড়েন, পক্ষ বাছাইয়ের চাপ

ইরানও এই পরিস্থিতিকে কৌশলগত সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে তেহরান নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং জব্দ সম্পদ মুক্ত করার মতো কঠোর দাবি তুলেছে। আন্তর্জাতিকভাবে এসব দাবির বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এগুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরান এখনো আলোচনার টেবিলে দুর্বল অবস্থানে নেই। বরং তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে।

আরও পড়ুন  হ্যারি কেইন বিশ্বকাপ পেনাল্টি গোল রেকর্ড ভেঙে ইতিহাস গড়লেন

হরমুজ সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কৌশলে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখছে, অন্যদিকে চীন ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উপসাগরীয় অঞ্চল, ইরান, চীন ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে ইসলামাবাদ একই সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগের পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করাও সেই পরিবর্তিত কৌশলের অংশ।

সব মিলিয়ে হরমুজ সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা কোনো দেশের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতকে নিজের শর্তে শেষ করা সহজ নয়। অবকাঠামো ধ্বংস করা সম্ভব হলেও রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করতে প্রয়োজন কূটনীতি, সমঝোতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান অচলাবস্থা তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্ব নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।