ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) ছাত্রশিবিরের এক নেতাকে ছাত্রদল নেতার থাপ্পড় দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিনভর উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি অবস্থানের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে ছাত্রশিবির, ছাত্রদল ও প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠনসহ চারটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তদন্ত কমিটিকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটিতে লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেলিমকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তফা আরীফ এবং ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মামুন আল রশীদ।
প্রশাসনের নেওয়া অন্য সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, আবাসিক হলে অভিযান ও বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ, সব ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সহাবস্থান নিশ্চিত করা এবং বিভাগ অনুযায়ী মেধার ভিত্তিতে আবাসিক হলের সিট বণ্টন করা।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুর পৌনে ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের করিডোরে হল শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি কাজী জুহায়েরকে থাপ্পড় মারার অভিযোগ ওঠে শাখা ছাত্রদলের সদস্য আলীনূর রহমানের বিরুদ্ধে।
কাজী জুহায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। অন্যদিকে আলীনূর রহমান আরবি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
থাপ্পড় দেওয়ার পর আলীনূর হলের ২১৭ নম্বর কক্ষে চলে যান। খবর পেয়ে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তারা আলীনূরের কক্ষের সামনে গিয়ে তাকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে কক্ষটি ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় উত্তেজনার একপর্যায়ে জানালার কাচ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
পরে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে বিষয়টি সমাধানের জন্য উভয় পক্ষের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে হল অফিসে আলোচনায় বসা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা আলীনূর রহমানকে তার কক্ষ থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেন। তবে শিবিরকর্মীদের উত্তেজনার কারণে তাকে বের করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় ছাত্রদলের নেতারা আলোচনা থেকে বের হয়ে যান।
তারা হল থেকে বের হওয়ার সময় উভয় পক্ষের মধ্যে উচ্চবাচ্য ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশি সহায়তায় আলীনূরকে প্রক্টরিয়াল বডির গাড়িতে করে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে শিবিরকর্মীরা তার ওপর চড়াও হন বলে অভিযোগ ওঠে। এ সময় প্রক্টরের গাড়ির জানালার কাচ ভেঙে যায়।
ঘটনার পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে। বিকেল ৪টার দিকে গাড়ি চলাচল আটকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে ছাত্রদল। এ সময় প্রধান ফটক এলাকায় রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র হাতে বহিরাগতদের মহড়া দিতে দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
অন্যদিকে একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া মোড়ে লাঠিসোঁটা হাতে অবস্থান নেয় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। দুই পক্ষের এমন অবস্থানের কারণে ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ও উত্তেজনা তৈরি হয়।
পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক খুলে দেন। এরপর তারা ফটকের সামনের এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যান।
এ সময় স্থানীয় কয়েকজন জামায়াতকর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এলে তাদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে শহীদুল ও বাবুল নামে দুই জামায়াতকর্মী আহত হন।
আহতদের স্থানীয় হরিনারায়ণপুর চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এরপর স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা খুলনা-কুষ্টিয়া মহাসড়কে অবস্থান নেন। প্রায় দুই ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ করে তারা বিক্ষোভ করেন। একই সময়ে ক্যাম্পাসেও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মহড়া দিতে দেখা যায়।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া মোড়, লালন শাহ হলের পকেট গেট এবং আজিজ হলের পকেট গেট এলাকায় স্থানীয় জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। এতে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রবেশপথে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। দীর্ঘ আলোচনার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়।
দিনভর উত্তেজনার পর সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে প্রশাসন, ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে চারটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রথমত, ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তৃতীয়ত, আবাসিক হলগুলোতে অভিযান চালানো এবং বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সহাবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি আবাসিক হলগুলোতে বিভাগ অনুযায়ী মেধার ভিত্তিতে সিট বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব রাফিজ আহমেদ বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সুষ্ঠু সমাধানের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তারা আলোচনায় বসেছেন।
তিনি বলেন, উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে তারা আশা করছেন।
তিনি আরও বলেন, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে এবং যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
দিনভর উত্তেজনা, বিক্ষোভ ও পাল্টাপাল্টি অবস্থানের পর বর্তমানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ঘটনাকে ঘিরে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ক্যাম্পাসে পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে হলে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ, মেধার ভিত্তিতে সিট বণ্টন এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর সহাবস্থান নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হয়, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


























