ঢাকা ০৯:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঝরে পড়া নয়, প্রতিটি শিক্ষার্থীই হোক সম্ভাবনার আলো

শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন উদ্যোগ

শিক্ষা একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর একজন শিক্ষার্থী কতজন শেষ পর্যন্ত এসএসসি, উচ্চমাধ্যমিক কিংবা উচ্চশিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে যেতে পারছেন—এই প্রশ্নের উত্তর সবসময় সহজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রকৃত চিত্র অনেক সময় কাগজ-কলমের হিসাবের আড়ালেই থেকে যায়।

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত তথ্য সেই বাস্তবতারই একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে নবম শ্রেণিতে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধিত ছিলেন ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন। কিন্তু ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন ফরম পূরণ করেন। অর্থাৎ প্রায় ৪ লাখ ৪৭ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষার চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছাতে পারেননি।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার বিষয়টি শুধু পরীক্ষায় অনুপস্থিতির হিসাব দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর কয়েক বছর ধরে শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তাঁর নাম অনেক সময় বিদ্যালয়ের নথিতে থেকে যেতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ না করলে সেই শিক্ষার্থী বাস্তবে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অনেকটাই বাইরে চলে যান।

২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন নিয়মিত শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন ফরম পূরণ করায় প্রায় ৪ লাখ ৪৭ হাজার শিক্ষার্থী এই পর্যায়েই অনুপস্থিত হয়ে পড়েছেন। অর্থাৎ দুই বছর আগে নবম শ্রেণিতে থাকা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগই পাননি।

এরপরও রয়েছে আরেকটি ধাপ। ফরম পূরণ করলেও সবাই শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার হলে উপস্থিত হননি। ফলে বিদ্যালয়ে ভর্তি, নিবন্ধন, ফরম পূরণ এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণ—প্রতিটি ধাপেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। পরিবার ও শিক্ষার্থীর আর্থিক পরিস্থিতি, বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম, কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়া, বিদেশে চলে যাওয়া, বাসস্থান পরিবর্তন এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো বিভিন্ন কারণ এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে এখনো বড় একটি বাধা। মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সময় অনেক কিশোরীর বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর পারিবারিক দায়িত্বের কারণে তাদের শিক্ষাজীবন আর এগোয় না।

অন্যদিকে ছেলেদের একটি অংশ পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে যুক্ত হয়। কেউ স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানে যায়, কেউ আবার বিদেশে পাড়ি জমায়। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে সন্তানের আয় অনেক সময় পরিবারের টিকে থাকার অন্যতম অবলম্বন হয়ে ওঠে।

কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে। কেউ কাজ হারিয়েছে, কেউ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে গেছে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব শিশু-কিশোরদের শিক্ষাজীবনের ওপরও পড়েছে।

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন পাস করেছেন এবং ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন অকৃতকার্য হয়েছেন। সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ।

এই পাসের হার গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমেছে।

তবে শুধু যারা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে তাদের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে শিক্ষাব্যবস্থার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। যারা পরীক্ষার আগেই শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে গেছে, তাদের সংখ্যাও বিবেচনায় নিতে হবে।

অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী ফেল করেছে—এটি যেমন শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগেই হারিয়ে গেছে—এটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রায় ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। সংখ্যার হিসাবে এই শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন।

এই বিশালসংখ্যক তরুণ-তরুণীকে শুধু ‘ফেল করা শিক্ষার্থী’ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁদের পুনরায় পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মমুখী শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, ভাষা শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং বিভিন্ন পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব তরুণকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব।

একই সঙ্গে যারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের জন্য সহজ শর্তে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ, অতিরিক্ত একাডেমিক সহায়তা এবং বিষয়ভিত্তিক কাউন্সেলিং আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।

একজন শিক্ষার্থী স্কুল থেকে পুরোপুরি ঝরে পড়ার আগেই তার সমস্যাটি শনাক্ত করা জরুরি। কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এলে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কারণ খুঁজে বের করতে হবে।

পরিবারে অর্থনৈতিক সংকট থাকলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও শিক্ষা সহায়তার সঙ্গে শিক্ষার্থীকে যুক্ত করা যেতে পারে। বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা মেয়েদের জন্য পরিবার ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

একইভাবে কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়ে পড়া কিশোরদের জন্য নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। যাতে কাজের পাশাপাশি তারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রকৃত চিত্র জানতে হলে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত শিক্ষার্থী ডাটাবেজ থাকা প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী কোন শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে, কখন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত হতে শুরু করেছে, কেন পড়াশোনা ছেড়েছে এবং পরে কোথায় গেছে—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা দরকার।

এতে শুধু কতজন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে তা জানা যাবে না; কোন এলাকায়, কোন শ্রেণিতে এবং কোন আর্থসামাজিক পরিবারের শিক্ষার্থী বেশি ঝরে পড়ছে, সেটিও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো শনাক্ত করে সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ার জন্য এমন তথ্যভান্ডার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফলাফলে আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। দেশের ৩১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি।

এই তথ্যও শিক্ষার মান, শিক্ষকসংকট, অবকাঠামো, শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।

কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ব্যর্থ হলে শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী না করে সেই প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শিক্ষা পরিবেশও বিশ্লেষণ করা দরকার।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়া বন্ধ করতে হলে প্রথমেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। যে শিশু বা কিশোর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, তাকে ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত করার বদলে জানতে হবে—কেন সে ঝরে পড়েছে।

কেউ হয়তো অর্থের অভাবে পড়াশোনা ছাড়ছে, কেউ পারিবারিক চাপে, কেউ বাল্যবিয়ের কারণে, আবার কেউ হয়তো নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো দিকনির্দেশনা পাচ্ছে না।

প্রতিটি কারণের জন্য আলাদা সমাধান প্রয়োজন। তাই একই ধরনের কর্মসূচি দিয়ে সব শিক্ষার্থীকে শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

একজন শিক্ষার্থী স্কুলে নিয়মিত যেতে না পারলেও তার মেধা বা সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। শিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্ব হলো সেই সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করা এবং বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া।

ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগের শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং কর্মমুখী শিক্ষার পথ আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে।

কারণ একটি দেশের উন্নয়ন শুধু কতজন জিপিএ-৫ পেল তার ওপর নির্ভর করে না। বরং কতজন তরুণকে দক্ষ, আত্মনির্ভর ও উৎপাদনশীল নাগরিকে পরিণত করা গেল—সেটিই দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ঝরে পড়া কমানো নয়; বরং কোনো শিক্ষার্থী যেন পরিস্থিতির কারণে নিজের সম্ভাবনা হারিয়ে না ফেলে। বিদ্যালয়ের দরজা থেকে শুরু করে কর্মজীবন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে আজকের ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আগামী দিনের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঝরে পড়া নয়, প্রতিটি শিক্ষার্থীই হোক সম্ভাবনার আলো

Update Time : ০৮:০৮:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিক্ষা একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর একজন শিক্ষার্থী কতজন শেষ পর্যন্ত এসএসসি, উচ্চমাধ্যমিক কিংবা উচ্চশিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে যেতে পারছেন—এই প্রশ্নের উত্তর সবসময় সহজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রকৃত চিত্র অনেক সময় কাগজ-কলমের হিসাবের আড়ালেই থেকে যায়।

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত তথ্য সেই বাস্তবতারই একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে নবম শ্রেণিতে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধিত ছিলেন ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন। কিন্তু ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন ফরম পূরণ করেন। অর্থাৎ প্রায় ৪ লাখ ৪৭ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষার চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছাতে পারেননি।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার বিষয়টি শুধু পরীক্ষায় অনুপস্থিতির হিসাব দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর কয়েক বছর ধরে শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তাঁর নাম অনেক সময় বিদ্যালয়ের নথিতে থেকে যেতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ না করলে সেই শিক্ষার্থী বাস্তবে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অনেকটাই বাইরে চলে যান।

২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন নিয়মিত শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন ফরম পূরণ করায় প্রায় ৪ লাখ ৪৭ হাজার শিক্ষার্থী এই পর্যায়েই অনুপস্থিত হয়ে পড়েছেন। অর্থাৎ দুই বছর আগে নবম শ্রেণিতে থাকা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগই পাননি।

এরপরও রয়েছে আরেকটি ধাপ। ফরম পূরণ করলেও সবাই শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার হলে উপস্থিত হননি। ফলে বিদ্যালয়ে ভর্তি, নিবন্ধন, ফরম পূরণ এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণ—প্রতিটি ধাপেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। পরিবার ও শিক্ষার্থীর আর্থিক পরিস্থিতি, বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম, কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়া, বিদেশে চলে যাওয়া, বাসস্থান পরিবর্তন এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো বিভিন্ন কারণ এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

আরও পড়ুন  চুয়েটের পুকুরে গোসল করতে নেমে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু

মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে এখনো বড় একটি বাধা। মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সময় অনেক কিশোরীর বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর পারিবারিক দায়িত্বের কারণে তাদের শিক্ষাজীবন আর এগোয় না।

অন্যদিকে ছেলেদের একটি অংশ পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে যুক্ত হয়। কেউ স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানে যায়, কেউ আবার বিদেশে পাড়ি জমায়। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে সন্তানের আয় অনেক সময় পরিবারের টিকে থাকার অন্যতম অবলম্বন হয়ে ওঠে।

কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে। কেউ কাজ হারিয়েছে, কেউ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে গেছে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব শিশু-কিশোরদের শিক্ষাজীবনের ওপরও পড়েছে।

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন পাস করেছেন এবং ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন অকৃতকার্য হয়েছেন। সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ।

এই পাসের হার গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমেছে।

তবে শুধু যারা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে তাদের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে শিক্ষাব্যবস্থার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। যারা পরীক্ষার আগেই শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে গেছে, তাদের সংখ্যাও বিবেচনায় নিতে হবে।

অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী ফেল করেছে—এটি যেমন শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগেই হারিয়ে গেছে—এটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রায় ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। সংখ্যার হিসাবে এই শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন।

আরও পড়ুন  শিশুর পড়াশোনা-স্বাস্থ্যের খোঁজ রাখতে চালু হচ্ছে ‘প্যারেন্ট সার্কেল’

এই বিশালসংখ্যক তরুণ-তরুণীকে শুধু ‘ফেল করা শিক্ষার্থী’ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁদের পুনরায় পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মমুখী শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, ভাষা শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং বিভিন্ন পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব তরুণকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব।

একই সঙ্গে যারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের জন্য সহজ শর্তে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ, অতিরিক্ত একাডেমিক সহায়তা এবং বিষয়ভিত্তিক কাউন্সেলিং আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।

একজন শিক্ষার্থী স্কুল থেকে পুরোপুরি ঝরে পড়ার আগেই তার সমস্যাটি শনাক্ত করা জরুরি। কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এলে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কারণ খুঁজে বের করতে হবে।

পরিবারে অর্থনৈতিক সংকট থাকলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও শিক্ষা সহায়তার সঙ্গে শিক্ষার্থীকে যুক্ত করা যেতে পারে। বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা মেয়েদের জন্য পরিবার ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

একইভাবে কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়ে পড়া কিশোরদের জন্য নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। যাতে কাজের পাশাপাশি তারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রকৃত চিত্র জানতে হলে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত শিক্ষার্থী ডাটাবেজ থাকা প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী কোন শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে, কখন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত হতে শুরু করেছে, কেন পড়াশোনা ছেড়েছে এবং পরে কোথায় গেছে—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা দরকার।

এতে শুধু কতজন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে তা জানা যাবে না; কোন এলাকায়, কোন শ্রেণিতে এবং কোন আর্থসামাজিক পরিবারের শিক্ষার্থী বেশি ঝরে পড়ছে, সেটিও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো শনাক্ত করে সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ার জন্য এমন তথ্যভান্ডার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন  এআইইউবি প্রতিষ্ঠাতা ডা. আনোয়ারুল আবেদীনের মৃত্যুবার্ষিকী ৫ সেপ্টেম্বর

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফলাফলে আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। দেশের ৩১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি।

এই তথ্যও শিক্ষার মান, শিক্ষকসংকট, অবকাঠামো, শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।

কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ব্যর্থ হলে শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী না করে সেই প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শিক্ষা পরিবেশও বিশ্লেষণ করা দরকার।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়া বন্ধ করতে হলে প্রথমেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। যে শিশু বা কিশোর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, তাকে ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত করার বদলে জানতে হবে—কেন সে ঝরে পড়েছে।

কেউ হয়তো অর্থের অভাবে পড়াশোনা ছাড়ছে, কেউ পারিবারিক চাপে, কেউ বাল্যবিয়ের কারণে, আবার কেউ হয়তো নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো দিকনির্দেশনা পাচ্ছে না।

প্রতিটি কারণের জন্য আলাদা সমাধান প্রয়োজন। তাই একই ধরনের কর্মসূচি দিয়ে সব শিক্ষার্থীকে শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

একজন শিক্ষার্থী স্কুলে নিয়মিত যেতে না পারলেও তার মেধা বা সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। শিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্ব হলো সেই সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করা এবং বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া।

ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগের শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং কর্মমুখী শিক্ষার পথ আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে।

কারণ একটি দেশের উন্নয়ন শুধু কতজন জিপিএ-৫ পেল তার ওপর নির্ভর করে না। বরং কতজন তরুণকে দক্ষ, আত্মনির্ভর ও উৎপাদনশীল নাগরিকে পরিণত করা গেল—সেটিই দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ঝরে পড়া কমানো নয়; বরং কোনো শিক্ষার্থী যেন পরিস্থিতির কারণে নিজের সম্ভাবনা হারিয়ে না ফেলে। বিদ্যালয়ের দরজা থেকে শুরু করে কর্মজীবন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে আজকের ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আগামী দিনের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হতে পারে।