যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষা নিয়ে টিকটকের দেওয়া তথ্য বিভ্রান্তিকর ছিল বলে রায় দিয়েছেন। আদালতের মতে, প্ল্যাটফর্মে শিশুদের জন্য কনটেন্ট বাছাই এবং ‘রেস্ট্রিক্টেড মোড’ নিয়ে টিকটক যেভাবে ব্যবহারকারীদের ধারণা দিয়েছিল, বাস্তব ব্যবস্থার সঙ্গে তার মিল ছিল না।
বৃহস্পতিবার দেওয়া রায়ে টেক্সাসের বিচারক কোরি লিউ বলেন, টিকটকের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি অঙ্গরাজ্যটির ভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করেছে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের অনুপযুক্ত কনটেন্ট থেকে সুরক্ষার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রচার ও বাস্তব ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য ছিল বলে আদালত মনে করেছেন।
এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে টেক্সাস টিকটকের বিরুদ্ধে মামলা করে। অঙ্গরাজ্যটির অভিযোগ ছিল, টিকটক নিজেদের প্ল্যাটফর্মকে শিশুদের জন্য নিরাপদ হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে অনুপযুক্ত কনটেন্ট ঠেকাতে তাদের ব্যবস্থাগুলো সেই দাবির মতো কার্যকর ছিল না।
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল টিকটকের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। ব্যবহারকারীদের জানানো হয়েছিল, কমিউনিটি গাইডলাইন লঙ্ঘনকারী কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু টেক্সাসের অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু কনটেন্ট সরিয়ে না দিয়ে শুধু ব্যবহারকারীদের কাছে সেগুলো খুঁজে পাওয়া কঠিন করে রাখা হতো। ফলে সংশ্লিষ্ট কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মে থেকে যেত এবং ব্যবহারকারীরা চাইলে সেগুলো দেখতে পারতেন।
বিচারক লিউ টেক্সাসের এই অভিযোগের সঙ্গে একমত হয়েছেন। তাঁর রায়ে বলা হয়েছে, কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের এমন পদ্ধতি ব্যবহারকারীদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না এবং তা অঙ্গরাজ্যের ভোক্তা সুরক্ষা আইনের আওতায় সমস্যাজনক।
‘রেস্ট্রিক্টেড মোড’ নিয়েও আদালত টিকটকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই ফিচারটি শিশু ও কিশোরদের অনুপযুক্ত কনটেন্ট থেকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কথা বলা হলেও আদালতের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এটি সব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিতভাবে কাজ করেনি। ফলে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীরা এমন কিছু কনটেন্ট দেখতে পেরেছে, যা ফিচারটি সক্রিয় থাকলে তাদের সামনে আসার কথা ছিল না।
বিচারক লিউ বলেন, টেক্সাস এমন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পেরেছে, যার ভিত্তিতে বলা যায় যে টিকটকের ‘রেস্ট্রিক্টেড মোড’ প্রতিষ্ঠানটির প্রচারের মতো কার্যকর ছিল না। এ কারণে শিশু ও কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে টিকটকের দাবিগুলো নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
তবে এই রায়ের পরই টিকটকের বিরুদ্ধে জরিমানার পরিমাণ চূড়ান্ত হয়নি। টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের কার্যালয় জানিয়েছে, মামলাটি এখন বিচারপর্বে যাবে। সেখানে টিকটকের বিরুদ্ধে কত জরিমানা আরোপ করা হবে এবং কী ধরনের অন্যান্য আইনি প্রতিকার দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হবে। আগামী মাসে এ বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
টিকটকের বিরুদ্ধে শিশু ও তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আইনি চাপ সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেড়েছে। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে দায়ের করা তিনটি মামলার মীমাংসায় রাজি হয় প্রতিষ্ঠানটি। এসব মামলায় তরুণ বাদীরা অভিযোগ করেছিলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীরা সহজেই এতে আসক্ত হয়ে পড়েন এবং এর নেতিবাচক প্রভাব তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়তে পারে।
একই সময়ে Meta Platforms-এর বিরুদ্ধেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক মামলা চলছিল। এসব মামলা নিষ্পত্তির জন্য মেটা সর্বোচ্চ ১৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দিতে সম্মত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টেক্সাসের মামলায় এখন মূলত জরিমানা ও অন্যান্য আইনি প্রতিকারের বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে। ফলে এই মামলা শুধু টিকটকের জন্য নয়, শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, অনুপযুক্ত কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রচারিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।




























