ডায়াবেটিক ফুট সার্জারি নামটি শুনলেই অনেকের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে ডায়াবেটিসের কারণে পায়ে গুরুতর ক্ষত, সংক্রমণ বা রক্ত চলাচলের সমস্যা দেখা দিলেই যে অস্ত্রোপচার করতে হবে, এমন নয়। শুরুতেই সমস্যা শনাক্ত করে চিকিৎসা নিলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব। তবে ক্ষত গভীর হলে, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে বা সাধারণ চিকিৎসায় ক্ষত না শুকালে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। ডায়াবেটিসে স্নায়ুর ক্ষতির কারণে পায়ের অনুভূতি কমে যেতে পারে। ফলে ছোট ক্ষত বা ফোসকাও অনেক সময় রোগীর নজরে আসে না।
ডায়াবেটিক ফুট সার্জারির প্রধান লক্ষ্য শুধু ক্ষত সারানো নয়, বরং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করে পা যতটা সম্ভব রক্ষা করা। পায়ে মৃত বা সংক্রমিত টিস্যু জমে গেলে সেটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হতে পারে। কোথাও পুঁজ জমে ফোঁড়া তৈরি হলে সেটিও চিকিৎসকের পরামর্শে খুলে পরিষ্কার করা হয়। আবার পায়ের রক্ত চলাচল কমে গেলে রক্তনালির চিকিৎসা, অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি বা প্রয়োজন অনুযায়ী বাইপাসের মতো পদ্ধতি বিবেচনা করা হতে পারে। কোন পদ্ধতি দরকার, তা নির্ভর করে ক্ষতের অবস্থা, সংক্রমণ, রক্তপ্রবাহ ও রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর।
সব ডায়াবেটিক রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না। তবে পায়ের ক্ষত দীর্ঘদিনেও না শুকানো, চারপাশে লালচে বা ফুলে যাওয়া, অতিরিক্ত গরম অনুভূত হওয়া, পুঁজ বা দুর্গন্ধ বের হওয়া এবং ক্ষত বড় হতে থাকা—এসব লক্ষণকে অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে অনুভূতি কমে গেলে ব্যথা না থাকলেও ক্ষত গুরুতর হতে পারে। ক্ষত গভীর হয়ে হাড় পর্যন্ত পৌঁছে গেলে বা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
অস্ত্রোপচারের পরও চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ক্ষতের নিয়মিত পরিচর্যা। চিকিৎসক যতদিন পায়ে চাপ কম রাখতে বলেন, ততদিন তা মেনে চলতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ জুতা, ব্রেস বা অন্য সহায়ক ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি, কারণ অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ক্ষত সারতে বাধা দিতে পারে। ধূমপান করলে তা বন্ধ করার পরামর্শও দেওয়া হয়, কারণ ধূমপান পায়ের রক্ত চলাচল কমিয়ে ক্ষত শুকানোর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
পা সুস্থ রাখতে প্রতিদিন কয়েক মিনিট সময় দিয়ে পায়ের তলা, আঙুলের ফাঁক ও নখের আশপাশ পরীক্ষা করা ভালো। কাটা, ফোসকা, ফাটল, লালচে দাগ বা ফোলা দেখা গেলে নিজে থেকে চিকিৎসা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। খালি পায়ে হাঁটা এড়িয়ে চলা এবং আরামদায়ক, সঠিক মাপের জুতা ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ। পায়ের কড়া বা ক্ষত নিজে ব্লেড দিয়ে কাটার মতো কাজ করা উচিত নয়। নিয়মিত পা পরীক্ষা ও যথাযথ পরিচর্যা অনেক গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডায়াবেটিক ফুট সার্জারি কোনো একক ধরনের অস্ত্রোপচার নয়। রোগীর সমস্যা অনুযায়ী চিকিৎসার ধরন পরিবর্তিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে বড় অস্ত্রোপচার বা অঙ্গচ্ছেদের প্রয়োজন এড়ানো সম্ভব। তাই পায়ে ক্ষত, ফোলা, রঙের পরিবর্তন, সংক্রমণ বা অনুভূতি কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত পা পরীক্ষা এবং সঠিক জুতা ব্যবহারের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।




























