একসময় এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অবাধে বিচরণ করত গন্ডার। বিশাল দেহ, মোটা চামড়া ও নাকের ওপর শিং- সব মিলিয়ে প্রাণীজগতের অন্যতম পরিচিত এই প্রাণী আজ মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
অবৈধ শিকার, গন্ডারের শিংয়ের বাণিজ্য এবং আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে প্রাণীটির কয়েকটি প্রজাতি বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
গন্ডারের সবচেয়ে বড় হুমকির একটি হলো তার শিং। শিংকে ঘিরে প্রচলিত নানা ভ্রান্ত বিশ্বাস ও অবৈধ বাণিজ্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই শিকারিদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে গন্ডার। প্রাণীটির সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বজুড়ে তুলে ধরতে প্রতিবছর ২২ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব গন্ডার দিবস।
দিনটি শুধু গন্ডারকে স্মরণ করার কোনো সাধারণ উপলক্ষ নয়। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণী পাচার, অবৈধ শিকার, বনভূমি ধ্বংস এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো মারাত্মক সমস্যাগুলো নিয়ে সচেতনতা তৈরিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন এটি।
বর্তমানে পৃথিবীতে গন্ডারের মোট ৫টি প্রজাতি রয়েছে। এগুলো হলো- সাদা গন্ডার, কালো গন্ডার, বৃহৎ একশৃঙ্গ গন্ডার, জাভান গন্ডার এবং সুমাত্রান গন্ডার।
আফ্রিকার সাদা ও কালো গন্ডারের পাশাপাশি এশিয়ার বৃহৎ একশৃঙ্গ, জাভান ও সুমাত্রান গন্ডার সংরক্ষণেও বর্তমানে চলছে নানা উদ্যোগ। তবে, সব প্রজাতির পরিস্থিতি এখন একইরকম নয়।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে সাদা গন্ডারের সংখ্যা আনুমানিক ১৫ হাজার ৭৫২টি এবং কালো গন্ডারের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৭৮৮টি। এ ছাড়া বৃহৎ একশৃঙ্গ গন্ডার রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৭৫টি।
অন্যদিকে, বিশ্বে জাভান গন্ডারের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৫০টি এবং সুমাত্রান গন্ডার রয়েছে আনুমানিক মাত্র ৩৪ থেকে ৪৭টি। এই পরিসংখ্যানই দেখিয়ে দেয়, বিশেষ করে জাভান ও সুমাত্রান গন্ডারের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রাণীর জীবন বাঁচানো কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
গন্ডারের শিং আসলে কোনো হাড় নয়। এটি মূলত কেরাটিন দিয়ে তৈরি, যে ধরনের প্রোটিন মানুষের চুল ও নখেও রয়েছে। কিন্তু শিংকে ঘিরে বিভিন্ন দেশে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা এবং এর অবৈধ বাণিজ্য গন্ডারকে শিকারিদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
আফ্রিকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ শিকার গন্ডারের জন্য বড় হুমকি হয়ে আছে। আইইউসিএনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে মোট ৫৮৬টি গন্ডার শিকারের ঘটনা শনাক্ত হয়।
তবে আশার কথা হলো, একই সময়ে আফ্রিকার কালো ও সাদা গন্ডারের সম্মিলিত সংখ্যা বেড়ে ২৩ হাজার ৮৮৫টিতে পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।
বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে জাভান ও সুমাত্রান গন্ডার। জাভান গন্ডার মূলত ইন্দোনেশিয়ার একটি এলাকাতেই টিকে আছে। সুমাত্রান গন্ডারের সংখ্যাও এত কমে গেছে যে, তাদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা এবং প্রজনন কার্যক্রম সফল করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
তবে, বিশ্বব্যাপী গন্ডার সংরক্ষণে সাফল্যের উদাহরণও রয়েছে। ভারতের কাজিরাঙাসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিনের সংরক্ষণ উদ্যোগের ফলে বৃহৎ একশৃঙ্গ গন্ডারের সংখ্যা বেশ বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, উপযুক্ত আবাসস্থল, কঠোর নজরদারি এবং অবৈধ শিকার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে গন্ডারের ভবিষ্যৎ বদলানো সম্ভব।
গন্ডারকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানো নয়। তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে বন, তৃণভূমি, জলাভূমি এবং এসব বাস্তুতন্ত্রের অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবন। তাই গন্ডার সংরক্ষণ আসলে বৃহত্তর জীববৈচিত্র্য রক্ষারই একটি অপরিহার্য অংশ।


























