রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার বেলা ১১টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলে তিনি এই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় দলের শীর্ষ নেতারা তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এবং প্রয়াত নেতার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে নীরবতা পালন করেন।
শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে সকাল থেকেই জিয়ার মাজার এলাকায় নেতা-কর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন জেলা ও মহানগর থেকে আসা বিএনপির নেতাকর্মীরা সকাল থেকেই সেখানে জড়ো হতে শুরু করেন। পুরো এলাকা ছিল দলীয় কর্মসূচি ও স্মরণানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সরগরম।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া মহিলা, শিশু ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেনও সেখানে অংশ নেন। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় দলের কেন্দ্রীয় ও সিনিয়র নেতাদেরও দেখা যায়। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা মাজার প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সবাই জিয়াউর রহমানের অবদান স্মরণ করে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় প্রয়াত রাষ্ট্রপতির স্মৃতির প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করা হয়। পরে উপস্থিত নেতারা তাঁর কর্মময় জীবন ও রাজনৈতিক অবদান নিয়ে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের উদ্যোগে আয়োজিত দোয়া মাহফিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেখানে অংশ নিয়ে বিশেষ মোনাজাতে শরিক হন। দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং প্রয়াত নেতার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা হয়ে আসছে। বিএনপি তাঁকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের গুলিতে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর প্রভাব ফেলে। সেই ঘটনার স্মরণে বিএনপি প্রতিবছর ৩০ মে ‘শাহাদাত দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে।
শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি এবারও ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ২৫ মে থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি টানা আট দিন চলবে। এর মাধ্যমে দলটি তাদের প্রতিষ্ঠাতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং তাঁর রাজনৈতিক দর্শন জনগণের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
দিবসটি উপলক্ষে ভোর থেকেই নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। একই সঙ্গে জাতীয় পতাকা ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই কর্মসূচি পালন করা হয়।
বিএনপির নেতারা জানান, জিয়াউর রহমানের স্মরণে শুধু আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মসূচিও আয়োজন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে। দলীয় নেতারা এটিকে প্রতিষ্ঠাতার আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নেতারা জিয়ার কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পাশাপাশি যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, কৃষক দল, মহিলা দল এবং ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও পৃথকভাবে সেখানে যান। তারা সবাই জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করেন।
এছাড়া বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, চিকিৎসক সংগঠন, শিক্ষাবিদ ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও সমাধিস্থলে উপস্থিত হন। তাঁদের অনেকেই দোয়া মাহফিলে অংশ নেন। ফলে পুরো কর্মসূচি একটি বৃহৎ স্মরণানুষ্ঠানে পরিণত হয়।
বিএনপির নেতারা মনে করেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন এবং জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা এখনও দলের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছে। শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসব বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে।
আগামীকাল রোববার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। বেলা আড়াইটা থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এই সভার। সেখানে দলের শীর্ষ নেতারা জিয়াউর রহমানের জীবন, কর্ম এবং রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে বক্তব্য রাখবেন।
আলোচনা সভায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিএনপি আশা করছে, এই আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মানও জানানো হবে।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সামাজিক সহায়তামূলক কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন বলে জানানো হয়েছে। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের টিঅ্যান্ডটি ভবনের সামনে থেকে এই কার্যক্রম শুরু হবে। সেখানে দুস্থ মানুষের মধ্যে বস্ত্র ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হবে।
দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই কর্মসূচির আওতায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। ঈদ ও সামগ্রিক সামাজিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বিপুল সংখ্যক মানুষ উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মোট ১৭টি স্থানে এই কর্মসূচি পরিচালিত হবে। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এসব কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর লক্ষ্যও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
দলের নেতারা বলছেন, জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী কেবল একটি স্মরণ দিবস নয়, এটি দলীয় ঐক্য ও আদর্শিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করারও একটি উপলক্ষ। তাই শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল এবং মানবিক সহায়তা কর্মসূচিকে একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাতার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানোর পাশাপাশি জনসেবার বার্তাও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিএনপি তাদের প্রতিষ্ঠাতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছে। মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ থেকে শুরু করে দোয়া, আলোচনা এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম—সবকিছুতেই ছিল জিয়াউর রহমানকে স্মরণের আবহ। দলের নেতারা আশা করছেন, এই কর্মসূচিগুলো তাঁর আদর্শ ও স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছেও আরও সুপরিচিত করে তুলবে।





















