নীলফামারীতে কোল্ড স্টোরেজের অতিরিক্ত ভাড়া কমানোর দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন আলুচাষি ও কৃষকরা। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শতাধিক কৃষক এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে অভিযোগ করেন, প্রতি বছর কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষকদের দাবি, আলুর উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে অতিরিক্ত ভাড়া তাদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কৃষকরা জানান, আলু সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজের ওপর নির্ভর করা ছাড়া তাদের বিকল্প নেই। মৌসুমে আলুর দাম কম থাকায় অনেক কৃষক ভবিষ্যতে ভালো দামের আশায় আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া বেশি হওয়ায় সংরক্ষণ খরচ বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত লাভের পরিবর্তে লোকসানের মুখে পড়তে হয়।
সোমবার সকালে জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আয়োজিত মানববন্ধনে বিভিন্ন কৃষক সংগঠনের নেতারাও অংশ নেন। তারা বলেন, কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। অন্যথায় কৃষকরা আগামী মৌসুমে আলু চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।
বক্তারা অভিযোগ করেন, গত কয়েক বছরে ধাপে ধাপে কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সময়ে সার, বীজ, সেচ, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ এবং সংরক্ষণ খরচ মিলিয়ে কৃষকদের ওপর দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন এবং ফসল বিক্রির পর সেই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক কৃষক বলেন, “আমরা বছরের পর বছর আলু চাষ করছি। কিন্তু এখন যে পরিমাণ খরচ বেড়েছে, তাতে আলু সংরক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া কমিয়ে কৃষকদের বাঁচানো হোক।”
কৃষকদের মতে, আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে হিমাগারে আলু রাখেন। বাজারে যখন দাম কম থাকে, তখন বিক্রি করলে উৎপাদন খরচও উঠে আসে না। তাই অধিকাংশ কৃষক কয়েক মাস আলু সংরক্ষণ করে পরে বিক্রির চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই সময় অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে লাভের বড় অংশ চলে যায়।
মানববন্ধনে বক্তারা আরও বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকদের টিকিয়ে রাখা জরুরি। কৃষক যদি উৎপাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে ভবিষ্যতে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। তাই কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণের পাশাপাশি কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থাপনাকেও কৃষকবান্ধব করতে হবে।
স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, নীলফামারী উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আলু উৎপাদনকারী জেলা। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আলু উৎপাদিত হয় এবং এর একটি বড় অংশ সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজে রাখা হয়। ফলে ভাড়ার হার বৃদ্ধি পেলে সরাসরি প্রভাব পড়ে জেলার হাজার হাজার কৃষকের ওপর।
মানববন্ধন থেকে কৃষকরা কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া কমানো, সংরক্ষণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কৃষকদের জন্য বিশেষ ভর্তুকি চালু করা এবং সংরক্ষণ ব্যয়ের ওপর সরকারি নজরদারি বৃদ্ধি করা। তারা বলেন, এসব দাবি বাস্তবায়ন হলে কৃষকরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষি খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও সংরক্ষণ ব্যয় যদি অতিরিক্ত বেড়ে যায়, তাহলে এর প্রভাব পুরো বাজার ব্যবস্থার ওপর পড়বে। ফলে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তেমনি ভোক্তারাও দীর্ঘমেয়াদে উচ্চমূল্যের চাপে পড়তে পারেন।
কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাড়া সমন্বয় করতে হয়েছে। তবে কৃষকরা মনে করেন, ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও তা যেন সহনীয় পর্যায়ে রাখা হয়।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কৃষক নেতারা বলেন, তারা সংঘাত নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিলে কৃষকদের উদ্বেগ অনেকটাই কমে যাবে। একই সঙ্গে তারা সরকারের কাছে কৃষি খাতকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা জানান, কৃষকদের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হবে এবং সমাধানের পথ খুঁজতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কৃষকদের এই মানববন্ধন শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়, বরং দেশের কৃষি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার প্রতিফলন। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সংরক্ষণ সংকট এবং বাজারমূল্যের অনিশ্চয়তার মধ্যে কৃষকরা প্রতিনিয়ত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন। এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান না হলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে সংরক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, বাজারে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং কৃষকরাও ন্যায্য লাভ পাবেন। এজন্য সরকার, কোল্ড স্টোরেজ মালিক এবং কৃষক প্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মানববন্ধনের শেষে কৃষকরা তাদের দাবি বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেন, দাবি পূরণ না হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং আলু চাষকে লাভজনক রাখতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।
নীলফামারীর এই মানববন্ধন কৃষকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকলে দেশের কৃষি ও অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





























