বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলোর একটি হলো, যে দেশ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ফুটবল তৈরি করে বিশ্বকে সরবরাহ করছে, সেই দেশই এখনো ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেনি। পাকিস্তানের শিয়ালকোট শহরই গত কয়েক দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম নেপথ্য শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
উত্তর-পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত শিয়ালকোটকে বলা হয় বিশ্বের ‘ফুটবল ফ্যাক্টরি’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মাঠে যে ফুটবল গড়িয়ে বেড়ায়, তার বিশাল একটি অংশ তৈরি হয় এই শহরের কারখানাগুলোতে। আন্তর্জাতিক ফুটবল শিল্পে শহরটির গুরুত্ব দিন দিন আরও বেড়েই চলেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ফুটবল শিয়ালকোটে উৎপাদিত হয়। প্রতিদিন তিন লাখেরও বেশি ফুটবল এখান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। এই বিপুল উৎপাদনশীলতাই শহরটিকে বিশ্ব ফুটবল শিল্পের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করেছে।
বিশ্বকাপের বছরগুলোতে শিয়ালকোটের ব্যস্ততা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও আন্তর্জাতিক সংস্থার বাড়তি চাহিদা মেটাতে দিন-রাত কাজ করেন স্থানীয় কারিগররা। একটি বিশ্বকাপ মৌসুমে প্রায় চার কোটি ফুটবল রপ্তানি হয় এই শহর থেকে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দল এখনো পর্যন্ত ফিফা বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি। অথচ বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি, অর্থাৎ ম্যাচ বল, দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানেই তৈরি হচ্ছে।
এই বৈপরীত্যই শিয়ালকোটকে ফুটবল বিশ্বের এক অনন্য পরিচয় এনে দিয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব নেই, অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরের নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করছে দেশটির একটি শহর।
শিয়ালকোটের সাফল্যের অন্যতম বড় নাম ‘ফরোয়ার্ড স্পোর্টস’। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে বিশ্বমানের ক্রীড়া সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে তারা বিশ্বের শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে কাজ করে আসছে।
গত কয়েকটি বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল তৈরির দায়িত্বও পালন করেছে এই প্রতিষ্ঠান। ২০১৪ সালের ‘ব্রাজুকা’, ২০১৮ সালের ‘টেলস্টার ১৮’, ২০২২ সালের ‘আল রিহলা’ এবং ২০২৬ সালের ‘ট্রায়ন্ডা’—টানা চারটি বিশ্বকাপের বল তৈরিতে ছিল শিয়ালকোটের কারিগরদের অবদান।
শিয়ালকোটের ফুটবল শিল্প শুধু অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করছে না, হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে। দক্ষ কারিগরদের হাতে তৈরি এসব ফুটবল বিশ্বের বড় বড় লিগ, ক্লাব ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ব্যবহার করা হয়।
ফুটবল মাঠে দর্শকরা যেমন তারকাদের নৈপুণ্য উপভোগ করেন, তেমনি সেই সৌন্দর্যের পেছনে থাকা শ্রম ও দক্ষতার গল্প অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। আর সেই অদেখা গল্পের সবচেয়ে বড় চরিত্র হলো পাকিস্তানের শিয়ালকোট।
ফুটবল বিশ্বে হয়তো পাকিস্তান এখনো বড় কোনো শক্তি নয়, কিন্তু ফুটবল তৈরির ক্ষেত্রে দেশটি এক অনন্য অবস্থানে পৌঁছে গেছে। তাই বলা যায়, বিশ্বকাপের ট্রফি না জিতলেও ফুটবলের নেপথ্য জগতে পাকিস্তানের শিয়ালকোট ইতোমধ্যেই এক অবিস্মরণীয় নাম হয়ে উঠেছে।



























