ঢাকা ০৬:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গোলশূন্য ড্রয়ে বেলজিয়ামকে রুখে দিল ইরান

গোলশূন্য ড্রয়ে বেলজিয়ামকে রুখে দিয়েছে ইরান। ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘জি’-তে শক্তিশালী বেলজিয়ামের বিপক্ষে দুর্দান্ত লড়াই করে মূল্যবান এক পয়েন্ট তুলে নিয়েছে ইরান। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি ০-০ গোলে ড্র হয়েছে। স্কোরলাইনে গোল না থাকলেও মাঠের লড়াই, নাটকীয় মুহূর্ত এবং দুই গোলরক্ষকের অসাধারণ পারফরম্যান্স ম্যাচটিকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে ছিল বেলজিয়াম। কেভিন ডি ব্রুইনা, রোমেলু লুকাকু এবং ম্যাক্সিম ডি কুইপারের নেতৃত্বে একের পর এক আক্রমণ চালায় ইউরোপের দলটি। কিন্তু প্রতিবারই তাদের সামনে অপ্রতিরোধ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়ান ইরানের গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ। তাঁর একাধিক দুর্দান্ত সেভ বেলজিয়ামকে গোলের দেখা পেতে দেয়নি।

অন্যদিকে ইরানও শুধু রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলেনি। সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠেছে তারা। বিশেষ করে মেহদি তারেমি ছিলেন ইরানের সবচেয়ে বড় আক্রমণভাগের ভরসা। প্রথমার্ধে তাঁর করা একটি দারুণ গোল ভিএআরের সিদ্ধান্তে অফসাইড হওয়ায় বাতিল হয়ে যায়। গোলটি বৈধ হলে ম্যাচের চিত্র পুরোপুরি বদলে যেতে পারত।

প্রথম ৪৫ মিনিটে বেলজিয়াম বলের দখল ও শট নেওয়ার দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও গোল করতে ব্যর্থ হয়। ইরানের রক্ষণভাগ ছিল অত্যন্ত সংগঠিত। প্রতিটি আক্রমণ ঠেকাতে তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করেছে। ফলে বেলজিয়ামের তারকা খেলোয়াড়দেরও বারবার হতাশ হতে হয়েছে।

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ৬৬তম মিনিটে ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বেলজিয়ামের ডিফেন্ডার নাথান এনগয় ভুল ব্যাকপাস দেওয়ার পর মেহদি তারেমিকে ফাউল করেন। গোলের সুস্পষ্ট সুযোগ নষ্ট করার কারণে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। ফলে শেষ প্রায় আধাঘণ্টা ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় বেলজিয়ামকে।

সংখ্যাগত সুবিধা পাওয়ার পর ইরান আক্রমণের গতি বাড়ায়। তবে বেলজিয়ামের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া অসাধারণ কয়েকটি সেভ করে দলকে রক্ষা করেন। বিশেষ করে তারেমির একটি জোরালো শট প্রতিহত করে তিনি ম্যাচে নিজের উপস্থিতি জানান দেন।

মজার বিষয় হলো, একজন কম নিয়ে খেললেও ম্যাচের শেষদিকে বেলজিয়ামই তুলনামূলক বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ডি ব্রুইনার পাস থেকে ম্যাক্সিম ডি কুইপার গোলের দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু বেইরানভান্দের অবিশ্বাস্য একহাতের সেভ দর্শকদের মুগ্ধ করে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা সেভ।

পুরো ম্যাচে ইরানের গোলরক্ষক বেইরানভান্দ ছিলেন ম্যাচসেরা। তিনি সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন এবং বারবার বেলজিয়ামের আক্রমণ ব্যর্থ করে দেন। তাঁর দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ এক পয়েন্ট এনে দেয়।

বেলজিয়ামের জন্য অবশ্য এই ড্র হতাশার। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তারা দুই ম্যাচ খেলেও কোনো জয় পায়নি। প্রথম ম্যাচে মিশরের সঙ্গে ১-১ ড্র করার পর এবার ইরানের বিপক্ষেও গোলশূন্য ড্র করতে হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দলটি এখনো নিজেদের কোনো খেলোয়াড়ের মাধ্যমে গোল করতে পারেনি।

একসময় বিশ্ব ফুটবলের ‘গোল্ডেন জেনারেশন’ হিসেবে পরিচিত বেলজিয়াম এখন নিজেদের সেরা ছন্দ খুঁজে পেতে সংগ্রাম করছে। কেভিন ডি ব্রুইনা, লুকাকু, কোর্তোয়ার মতো অভিজ্ঞ তারকা দলে থাকলেও মাঠে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে নকআউট পর্বে ওঠার লড়াইয়ে তারা চাপে পড়ে গেছে।

অন্যদিকে ইরানের জন্য এই ড্র অনেকটা জয়ের সমান। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে নানা প্রতিকূলতা, ভ্রমণ জটিলতা এবং প্রস্তুতির সমস্যার মধ্য দিয়েও দলটি দুর্দান্ত মানসিক শক্তির পরিচয় দিয়েছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২-২ ড্র করার পর এবার বেলজিয়ামের বিপক্ষেও পয়েন্ট তুলে নিয়ে তারা নিজেদের সম্ভাবনা উজ্জ্বল রেখেছে।

গ্রুপ ‘জি’-এর হিসাবও এখন জমে উঠেছে। দুই ম্যাচ শেষে বেলজিয়াম ও ইরান উভয়েরই দুই পয়েন্ট। ফলে শেষ ম্যাচের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে নকআউট পর্বে কারা জায়গা করে নেবে। ইরান তাদের শেষ ম্যাচে মিশরের মুখোমুখি হবে, আর বেলজিয়াম খেলবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে।

ম্যাচ শেষে ইরানের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে পেরে তারা গর্বিত। অন্যদিকে বেলজিয়াম শিবিরে ছিল হতাশা। সুযোগ তৈরি করেও গোল না পাওয়ার আক্ষেপ ছিল খেলোয়াড়দের চোখেমুখে।

সব মিলিয়ে গোলশূন্য হলেও ম্যাচটি ছিল রোমাঞ্চে ভরপুর। দুই গোলরক্ষকের অসাধারণ পারফরম্যান্স, একটি বাতিল গোল, একটি লাল কার্ড এবং শেষ মুহূর্তের কয়েকটি নাটকীয় আক্রমণ দর্শকদের উত্তেজনায় রেখেছিল শেষ বাঁশি পর্যন্ত। বিশ্বকাপের মঞ্চে ইরান প্রমাণ করেছে, তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি; বরং বড় দলগুলোর বিপক্ষেও সমানতালে লড়াই করার সামর্থ্য রাখে। আর বেলজিয়ামের জন্য এই ড্র একটি সতর্কবার্তা— দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান গ্রুপপর্বেই থেমে যেতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

গোলশূন্য ড্রয়ে বেলজিয়ামকে রুখে দিল ইরান

Update Time : ০৪:৪০:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘জি’-তে শক্তিশালী বেলজিয়ামের বিপক্ষে দুর্দান্ত লড়াই করে মূল্যবান এক পয়েন্ট তুলে নিয়েছে ইরান। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি ০-০ গোলে ড্র হয়েছে। স্কোরলাইনে গোল না থাকলেও মাঠের লড়াই, নাটকীয় মুহূর্ত এবং দুই গোলরক্ষকের অসাধারণ পারফরম্যান্স ম্যাচটিকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে ছিল বেলজিয়াম। কেভিন ডি ব্রুইনা, রোমেলু লুকাকু এবং ম্যাক্সিম ডি কুইপারের নেতৃত্বে একের পর এক আক্রমণ চালায় ইউরোপের দলটি। কিন্তু প্রতিবারই তাদের সামনে অপ্রতিরোধ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়ান ইরানের গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ। তাঁর একাধিক দুর্দান্ত সেভ বেলজিয়ামকে গোলের দেখা পেতে দেয়নি।

অন্যদিকে ইরানও শুধু রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলেনি। সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠেছে তারা। বিশেষ করে মেহদি তারেমি ছিলেন ইরানের সবচেয়ে বড় আক্রমণভাগের ভরসা। প্রথমার্ধে তাঁর করা একটি দারুণ গোল ভিএআরের সিদ্ধান্তে অফসাইড হওয়ায় বাতিল হয়ে যায়। গোলটি বৈধ হলে ম্যাচের চিত্র পুরোপুরি বদলে যেতে পারত।

প্রথম ৪৫ মিনিটে বেলজিয়াম বলের দখল ও শট নেওয়ার দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও গোল করতে ব্যর্থ হয়। ইরানের রক্ষণভাগ ছিল অত্যন্ত সংগঠিত। প্রতিটি আক্রমণ ঠেকাতে তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করেছে। ফলে বেলজিয়ামের তারকা খেলোয়াড়দেরও বারবার হতাশ হতে হয়েছে।

আরও পড়ুন  ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপে জয়ের স্বাদ, জর্ডানকে হারাল অস্ট্রিয়া

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ৬৬তম মিনিটে ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বেলজিয়ামের ডিফেন্ডার নাথান এনগয় ভুল ব্যাকপাস দেওয়ার পর মেহদি তারেমিকে ফাউল করেন। গোলের সুস্পষ্ট সুযোগ নষ্ট করার কারণে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। ফলে শেষ প্রায় আধাঘণ্টা ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় বেলজিয়ামকে।

সংখ্যাগত সুবিধা পাওয়ার পর ইরান আক্রমণের গতি বাড়ায়। তবে বেলজিয়ামের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া অসাধারণ কয়েকটি সেভ করে দলকে রক্ষা করেন। বিশেষ করে তারেমির একটি জোরালো শট প্রতিহত করে তিনি ম্যাচে নিজের উপস্থিতি জানান দেন।

মজার বিষয় হলো, একজন কম নিয়ে খেললেও ম্যাচের শেষদিকে বেলজিয়ামই তুলনামূলক বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ডি ব্রুইনার পাস থেকে ম্যাক্সিম ডি কুইপার গোলের দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু বেইরানভান্দের অবিশ্বাস্য একহাতের সেভ দর্শকদের মুগ্ধ করে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা সেভ।

আরও পড়ুন  মরক্কোর বিপক্ষে কেন ব্যর্থ ব্রাজিল? ৬ কারণ বিশ্লেষণ

পুরো ম্যাচে ইরানের গোলরক্ষক বেইরানভান্দ ছিলেন ম্যাচসেরা। তিনি সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন এবং বারবার বেলজিয়ামের আক্রমণ ব্যর্থ করে দেন। তাঁর দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ এক পয়েন্ট এনে দেয়।

বেলজিয়ামের জন্য অবশ্য এই ড্র হতাশার। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তারা দুই ম্যাচ খেলেও কোনো জয় পায়নি। প্রথম ম্যাচে মিশরের সঙ্গে ১-১ ড্র করার পর এবার ইরানের বিপক্ষেও গোলশূন্য ড্র করতে হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দলটি এখনো নিজেদের কোনো খেলোয়াড়ের মাধ্যমে গোল করতে পারেনি।

একসময় বিশ্ব ফুটবলের ‘গোল্ডেন জেনারেশন’ হিসেবে পরিচিত বেলজিয়াম এখন নিজেদের সেরা ছন্দ খুঁজে পেতে সংগ্রাম করছে। কেভিন ডি ব্রুইনা, লুকাকু, কোর্তোয়ার মতো অভিজ্ঞ তারকা দলে থাকলেও মাঠে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে নকআউট পর্বে ওঠার লড়াইয়ে তারা চাপে পড়ে গেছে।

অন্যদিকে ইরানের জন্য এই ড্র অনেকটা জয়ের সমান। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে নানা প্রতিকূলতা, ভ্রমণ জটিলতা এবং প্রস্তুতির সমস্যার মধ্য দিয়েও দলটি দুর্দান্ত মানসিক শক্তির পরিচয় দিয়েছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২-২ ড্র করার পর এবার বেলজিয়ামের বিপক্ষেও পয়েন্ট তুলে নিয়ে তারা নিজেদের সম্ভাবনা উজ্জ্বল রেখেছে।

আরও পড়ুন  আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ দল ঘোষণা: স্কালোনির ভরসা পুরোনো তারকারা

গ্রুপ ‘জি’-এর হিসাবও এখন জমে উঠেছে। দুই ম্যাচ শেষে বেলজিয়াম ও ইরান উভয়েরই দুই পয়েন্ট। ফলে শেষ ম্যাচের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে নকআউট পর্বে কারা জায়গা করে নেবে। ইরান তাদের শেষ ম্যাচে মিশরের মুখোমুখি হবে, আর বেলজিয়াম খেলবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে।

ম্যাচ শেষে ইরানের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে পেরে তারা গর্বিত। অন্যদিকে বেলজিয়াম শিবিরে ছিল হতাশা। সুযোগ তৈরি করেও গোল না পাওয়ার আক্ষেপ ছিল খেলোয়াড়দের চোখেমুখে।

সব মিলিয়ে গোলশূন্য হলেও ম্যাচটি ছিল রোমাঞ্চে ভরপুর। দুই গোলরক্ষকের অসাধারণ পারফরম্যান্স, একটি বাতিল গোল, একটি লাল কার্ড এবং শেষ মুহূর্তের কয়েকটি নাটকীয় আক্রমণ দর্শকদের উত্তেজনায় রেখেছিল শেষ বাঁশি পর্যন্ত। বিশ্বকাপের মঞ্চে ইরান প্রমাণ করেছে, তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি; বরং বড় দলগুলোর বিপক্ষেও সমানতালে লড়াই করার সামর্থ্য রাখে। আর বেলজিয়ামের জন্য এই ড্র একটি সতর্কবার্তা— দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান গ্রুপপর্বেই থেমে যেতে পারে।