লেবার পার্টির ভেতরে একসময় উপেক্ষিত ও মূলধারার নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখা হয়েছিল অ্যান্ডি বার্নহামকে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতার দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে এখন তিনিই যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে আলোচিত নাম। কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ ঘোষণার পর দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম।
মাত্র চার বছর আগেও বার্নহাম অভিযোগ করেছিলেন, লেবার পার্টির সম্মেলনের মূল মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থেকে তাঁকে বারবার বঞ্চিত করা হয়েছিল। তাঁর মতে, গ্রেটার ম্যানচেস্টারের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে এটি শুধু ব্যক্তিগত অবমূল্যায়ন ছিল না, বরং তাঁর পদ ও দায়িত্বের প্রতিও অসম্মান ছিল।
সেই পরিস্থিতি এখন অনেকটাই বদলে গেছে। যুক্তরাজ্যে গত এক দশকে একাধিকবার নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে লেবার পার্টির ভেতরে নতুন নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে আসতেই বার্নহামের নাম সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বার্নহামের দাবি, লেবার পার্টির মধ্যে একমাত্র তাঁরই এমন রাজনৈতিক দূরদর্শিতা রয়েছে, যা দিয়ে ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং রিফর্ম ইউকে পার্টির উত্থান মোকাবিলা করা সম্ভব। নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন অভিবাসনবিরোধী ও জনতুষ্টিবাদী রিফর্ম ইউকে গত বছরের শুরু থেকে বিভিন্ন জনমত জরিপে ধারাবাহিকভাবে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।
গত সপ্তাহে মেকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচনে বার্নহামের নিরঙ্কুশ জয় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে এমন একটি এলাকায় এই বিজয় এসেছে, যেখানে সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে রিফর্ম ইউকে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করেছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই জয় শুধু একটি আসনের সাফল্য নয়; বরং এটি প্রমাণ করেছে যে বার্নহাম এখনো সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম। ফলে লেবার পার্টির অনেক সংসদ সদস্যও এখন তাঁর নেতৃত্বের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।
লেবার এমপি অ্যালেক্স সোবেলের মতে, ভোটারদের সামনে দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার ক্ষেত্রে বার্নহাম নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় মুখ প্রয়োজন, যা বার্নহাম হতে পারেন।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি পান বার্নহাম। কঠোর বিধিনিষেধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরাঞ্চলের জনগণের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেওয়ায় তিনি ‘কিং অব দ্য নর্থ’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।
২০২০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরকারের সঙ্গে আর্থিক সহায়তা নিয়ে বিরোধে জড়ান বার্নহাম। সরকার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড প্রস্তাব করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং দাবি করেন, এটি প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।
টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত সেই রাজনৈতিক সংঘাত বার্নহামকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে নিজের অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষাকারী একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এর ফলে ম্যানচেস্টারের বাইরেও তাঁর জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে।
তবে বার্নহামের রাজনৈতিক যাত্রা বিতর্কমুক্ত নয়। সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন সময়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। কখনো জাতীয়করণের পক্ষে, কখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগদানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পর বর্তমানে তিনি অনেক বেশি মধ্যমপন্থী অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
তাঁর সমালোচকেরা বলেন, উচ্চশিক্ষিত ও দীর্ঘদিনের পেশাদার রাজনীতিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তবে সমর্থকদের মতে, পরিবর্তিত বাস্তবতায় নীতি সমন্বয় করা একজন দায়িত্বশীল নেতার বৈশিষ্ট্য।
সম্প্রতি সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং নেতৃত্বের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর বার্নহামের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, ভবিষ্যৎ সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের আশ্বাস পেয়েই স্ট্রিটিং প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বার্নহাম এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁর পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেননি। তবে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ড ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কিছু ইঙ্গিত দেয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে কথা বলে আসছেন।
তাঁর বিশ্বাস, লন্ডনের হাতে কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা কমিয়ে স্থানীয় জনগণের হাতে আরও বেশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত। এতে পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।
লিভারপুলে জন্ম নেওয়া বার্নহামের পারিবারিক পটভূমিও সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তাঁর বাবা ছিলেন টেলিফোন প্রকৌশলী এবং মা কাজ করতেন রিসেপশনিস্ট হিসেবে। পরবর্তীতে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন।
রাজনীতিতে প্রবেশের আগে তিনি গবেষক এবং পরে পার্লামেন্টারি উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। টনি ব্লেয়ারের সরকারের সময় জুনিয়র মন্ত্রী এবং পরে গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিসভায় সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০১০ ও ২০১৫ সালে লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও তিনি সফল হতে পারেননি। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তার কারণে এখন তিনি আবারও জাতীয় নেতৃত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
সমর্থকদের আস্থা ধরে রাখা এবং সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করা এখন বার্নহামের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁকে দেখাতে হবে যে তিনি শুধু জনপ্রিয় রাজনীতিকই নন, বরং দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং বিভক্ত ভোটারদের একত্রিত করার মতো কার্যকর নেতৃত্বও দিতে পারেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসই নির্ধারণ করবে অ্যান্ডি বার্নহাম সত্যিই যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কি না। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—একসময় যাঁকে মূল মঞ্চ থেকে দূরে রাখা হয়েছিল, তিনি এখন ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছেন।

























