ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে ৪-২ গোলের নাটকীয় জয় পেয়েছে মরক্কো। ম্যাচে দুইবার পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে পূর্ণ তিন পয়েন্ট তুলে নেয় আফ্রিকার প্রতিনিধিরা। এই জয়ে নকআউট পর্বের আগে নিজেদের সামর্থ্যের শক্ত বার্তাও দিয়েছে আটলাস লায়ন্সরা।
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মরক্কোর লক্ষ্য ছিল জয়। শুধু জয় নয়, বড় ব্যবধানে জিতে গ্রুপের শীর্ষস্থান দখলের সম্ভাবনাও ধরে রাখতে চেয়েছিল দলটি। পাশাপাশি তাদের নজর ছিল ব্রাজিল ও স্কটল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচের দিকেও। কারণ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে পরবর্তী রাউন্ডে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ পাওয়ার সুযোগ ছিল।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে দেখা যায় মরক্কোকে। কোচ ওয়াহবি রেগরাগুই তাঁর সেরা একাদশ মাঠে নামান। ব্রাহিম দিয়াজ, আজেদিন উনাহি এবং ইসমাইল সাইবারিকে নিয়ে শক্তিশালী আক্রমণভাগ সাজানো হয়। তবে শুরুতেই বড় ধাক্কা খেতে হয় তাদের।
খেলার মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই হাইতি এগিয়ে যায়। মরক্কোর অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনোর আত্মঘাতী গোলে উল্লাসে মেতে ওঠে ক্যারিবীয় দলটি। হঠাৎ পাওয়া এই গোল হাইতির খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়, আর মরক্কোকে ফেলে দেয় চাপে।
গোল হজম করার পর মরক্কো বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে আক্রমণের গতি বাড়ায়। একের পর এক সুযোগ তৈরি করলেও হাইতির গোলরক্ষক প্লাসিদে দুর্দান্ত কয়েকটি সেভ করে দলকে এগিয়ে রাখেন। তাঁর দৃঢ়তায় প্রথমার্ধের বড় একটি সময় পর্যন্ত লিড ধরে রাখতে সক্ষম হয় হাইতি।
ম্যাচের শেষ দিকে প্রথমার্ধে শুরু হয় নাটকীয়তা। হাইতির গোলরক্ষকের একটি ভুলের সুযোগ নিয়ে আশরাফ হাকিমি সমতাসূচক গোল করেন। তাঁর এই গোল মরক্কোকে নতুন করে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে এবং সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে দেয়।
তবে সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মাত্র দুই মিনিট পরই ইসিদোর অসাধারণ এক দূরপাল্লার শটে আবারও এগিয়ে যায় হাইতি। প্রায় ৩০ মিটার দূর থেকে নেওয়া শটটি সরাসরি জালে জড়িয়ে যায়। অনেকের মতে, এটি টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হবে।
দ্বিতীয়বার পিছিয়ে পড়ার পরও হাল ছাড়েনি মরক্কো। বিরতির ঠিক আগে ইসমাইল সাইবারি গোল করে ম্যাচে ২-২ সমতা ফেরান। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাওয়া এই গোল মরক্কোর জন্য নতুন আশা তৈরি করে এবং দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণাত্মক খেলার ভিত্তি গড়ে দেয়।
দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে পুরোপুরি বদলে যাওয়া একটি মরক্কোকে দেখা যায়। বলের দখল, পাসিং এবং আক্রমণের ধার—সবকিছুতেই আধিপত্য বিস্তার করে তারা। হাইতির রক্ষণভাগকে ক্রমাগত চাপে রেখে গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে দলটি।
একের পর এক আক্রমণে হাইতির ডিফেন্স ক্লান্ত হয়ে পড়তে থাকে। মরক্কোর মিডফিল্ডাররা মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে আক্রমণভাগে দ্রুত বল সরবরাহ করতে থাকেন। ফলে হাইতির খেলোয়াড়দের রক্ষণ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়।
ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন রাহিমি। আর নামার পরই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি। শাদি রিয়াদের নিখুঁত পাস থেকে গোল করে প্রথমবারের মতো মরক্কোকে এগিয়ে দেন এই তারকা ফুটবলার।
গোল পাওয়ার পর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায় মরক্কোর। তারা আক্রমণ অব্যাহত রাখে এবং ম্যাচের শেষ দিকে আরেকটি গোল আদায় করে নেয়। এবার রাহিমির তৈরি করা সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইয়াসিন গেসিম বল জালে জড়িয়ে দেন।
৪-২ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচ কার্যত মরক্কোর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তবে হাইতিও শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায়। অতিরিক্ত সময়ে দাকেন্স নাজনের একটি শক্তিশালী শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন ইয়াসিন বোনো।
বোনোর সেই সেভ ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রথমার্ধে আত্মঘাতী গোল করলেও শেষ মুহূর্তের দুর্দান্ত সেভের মাধ্যমে নিজের ভুল অনেকটাই পুষিয়ে দেন তিনি।
এই জয়ে মরক্কো পূর্ণ তিন পয়েন্ট অর্জন করলেও গ্রুপের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে নকআউট পর্বে তাদের মেক্সিকোর মনতেরেতে গিয়ে গ্রুপ ‘এফ’-এর চ্যাম্পিয়ন দলের মুখোমুখি হতে হবে।
তবে এই ম্যাচে মরক্কোর লড়াইয়ের মানসিকতা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। দুইবার পিছিয়ে পড়েও যেভাবে দলটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা তাদের মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ দেয়। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এমন প্রত্যাবর্তন আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে হাইতির জন্য এটি ছিল হতাশার ম্যাচ। দুইবার এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত পরাজয় মেনে নিতে হয়েছে তাদের। তবুও দলটির সাহসী ফুটবল এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা ফুটবলপ্রেমীদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব সামনে রেখে মরক্কোর এই জয় নিঃসন্দেহে বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। দলটি যদি একই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে এবারের বিশ্বকাপেও তারা বড় চমক দেখাতে সক্ষম হতে পারে।
হাইতির বিপক্ষে ৪-২ গোলের এই রোমাঞ্চকর জয় শুধু তিন পয়েন্টই এনে দেয়নি, বরং বিশ্বকাপের পরবর্তী ধাপের জন্য মরক্কোকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিশালী করে তুলেছে। ফুটবলপ্রেমীরা এখন অপেক্ষা করছেন নকআউট পর্বে আটলাস লায়ন্সদের পরবর্তী পরীক্ষার জন্য।





























