ঢাকা ০২:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

মেসি যেভাবে ফুটবল খেলেন, কাফকা সেভাবে গল্প লিখতেন

মেসি কাফকা ফুটবলের গল্প

ফুটবল কেবল গোল, জয়-পরাজয় কিংবা ট্রফির হিসাব নয়; কখনও কখনও এটি হয়ে ওঠে শিল্পের এক অনন্য প্রকাশ। সেই কারণেই অনেক ফুটবলারকে শুধু খেলোয়াড় হিসেবে নয়, শিল্পী হিসেবেও দেখা হয়। অস্ট্রিয়ার কিংবদন্তি মাটিয়াস সিন্ডেলার যেমন ছিলেন তাঁর সময়ের এক শিল্পী, তেমনি আধুনিক ফুটবলে সেই পরিচয় বহন করছেন লিওনেল মেসি।

বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার ছিলেন মাটিয়াস সিন্ডেলার। হালকা-পাতলা গড়নের কারণে তিনি ‘দ্য পেপার ম্যান’ নামে পরিচিত ছিলেন। শক্তিনির্ভর ফুটবলের বদলে ড্রিবলিং, নিখুঁত পাসিং, সৃজনশীলতা ও কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তিনি ফুটবলকে দিয়েছিলেন নতুন এক মাত্রা।

সিন্ডেলার মাঠে শুধু খেলতেন না, ফুটবলকে যেন জীবন্ত করে তুলতেন। তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে থাকতেন দর্শকরা। ভিয়েনার খ্যাতিমান লেখক ও সাংবাদিক ফ্রিডরিখ টরবার্গ একবার লিখেছিলেন, “সিন্ডেলার যেভাবে ফুটবল খেলতেন, কাফকা সেভাবে গল্প লিখতেন।” এই একটি বাক্যই ফুটবল ও শিল্পের সম্পর্ককে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে।

১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপের আগে অস্ট্রিয়া নাৎসি জার্মানির দখলে চলে যায়। ফলে অস্ট্রিয়ান ফুটবলারদের জার্মানির হয়ে খেলতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু কট্টর নাৎসিবিরোধী সিন্ডেলার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। নিজের নীতি ও বিশ্বাসের সঙ্গে আপস না করায় তিনি ইতিহাসে এক সাহসী প্রতীক হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে আছেন।

আজকের ফুটবলে সিন্ডেলারের সেই নান্দনিকতার উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয় লিওনেল মেসিকে। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি ফুটবলপ্রেমীদের বিস্মিত করে চলেছেন। টরবার্গ যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো মেসিকে নিয়েও একই মন্তব্য করতেন—“মেসি যেভাবে ফুটবল খেলেন, কাফকা সেভাবে গল্প লিখতেন।”

ফ্রাঞ্জ কাফকার সাহিত্য যেমন পাঠককে ভাবায়, তেমনি মেসির ফুটবলও প্রতিনিয়ত নতুন বিস্ময়ের জন্ম দেয়। তাঁর ড্রিবলিং, পাস কিংবা গোলের মুহূর্তগুলো অনেক সময় যুক্তির সীমা ছাড়িয়ে যায়। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার সময় তিনি যেন মাঠে এক নতুন গল্প রচনা করেন।

রোজারিওর ধুলোমাখা গলি থেকে শুরু হওয়া মেসির যাত্রা ছিল সংগ্রামে ভরা। শৈশবে গ্রোথ হরমোনের সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে তিনি বার্সেলোনায় যোগ দেন। একটি সাধারণ ন্যাপকিনে লেখা চুক্তি পরবর্তীতে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। বার্সেলোনার হয়ে অসংখ্য শিরোপা, একের পর এক ব্যালন ডি’অর এবং অসংখ্য রেকর্ড গড়ে মেসি নিজেকে নিয়ে গেছেন সর্বকালের সেরাদের কাতারে। পেপ গার্দিওলার অধীনে ‘ফলস নাইন’ ভূমিকায় তিনি ফুটবলকে নতুন ভাষা উপহার দিয়েছিলেন।

তবে ব্যক্তিগত সাফল্যের ভিড়েও তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল বিশ্বকাপ। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, কিন্তু মেসির গল্প এখনও শেষ হয়নি। ফুটবল মাঠে তিনি এখনও এমন সব মুহূর্ত উপহার দেন, যা ভক্তদের মনে করিয়ে দেয়—কিছু মানুষ শুধু খেলেন না, তাঁরা শিল্প সৃষ্টি করেন। আর সেই শিল্পীদের তালিকায় লিওনেল মেসির নাম থাকবে চিরকাল।

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল বনাম ভারত: শেফালির ঝড়ে ৫ উইকেটের হার

মেসি যেভাবে ফুটবল খেলেন, কাফকা সেভাবে গল্প লিখতেন

Update Time : ০৮:১১:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

ফুটবল কেবল গোল, জয়-পরাজয় কিংবা ট্রফির হিসাব নয়; কখনও কখনও এটি হয়ে ওঠে শিল্পের এক অনন্য প্রকাশ। সেই কারণেই অনেক ফুটবলারকে শুধু খেলোয়াড় হিসেবে নয়, শিল্পী হিসেবেও দেখা হয়। অস্ট্রিয়ার কিংবদন্তি মাটিয়াস সিন্ডেলার যেমন ছিলেন তাঁর সময়ের এক শিল্পী, তেমনি আধুনিক ফুটবলে সেই পরিচয় বহন করছেন লিওনেল মেসি।

বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার ছিলেন মাটিয়াস সিন্ডেলার। হালকা-পাতলা গড়নের কারণে তিনি ‘দ্য পেপার ম্যান’ নামে পরিচিত ছিলেন। শক্তিনির্ভর ফুটবলের বদলে ড্রিবলিং, নিখুঁত পাসিং, সৃজনশীলতা ও কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তিনি ফুটবলকে দিয়েছিলেন নতুন এক মাত্রা।

সিন্ডেলার মাঠে শুধু খেলতেন না, ফুটবলকে যেন জীবন্ত করে তুলতেন। তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে থাকতেন দর্শকরা। ভিয়েনার খ্যাতিমান লেখক ও সাংবাদিক ফ্রিডরিখ টরবার্গ একবার লিখেছিলেন, “সিন্ডেলার যেভাবে ফুটবল খেলতেন, কাফকা সেভাবে গল্প লিখতেন।” এই একটি বাক্যই ফুটবল ও শিল্পের সম্পর্ককে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে।

আরও পড়ুন  জার্মানির রোমাঞ্চকর জয়, ১২ বছর পর নকআউট নিশ্চিত

১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপের আগে অস্ট্রিয়া নাৎসি জার্মানির দখলে চলে যায়। ফলে অস্ট্রিয়ান ফুটবলারদের জার্মানির হয়ে খেলতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু কট্টর নাৎসিবিরোধী সিন্ডেলার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। নিজের নীতি ও বিশ্বাসের সঙ্গে আপস না করায় তিনি ইতিহাসে এক সাহসী প্রতীক হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে আছেন।

আজকের ফুটবলে সিন্ডেলারের সেই নান্দনিকতার উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয় লিওনেল মেসিকে। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি ফুটবলপ্রেমীদের বিস্মিত করে চলেছেন। টরবার্গ যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো মেসিকে নিয়েও একই মন্তব্য করতেন—“মেসি যেভাবে ফুটবল খেলেন, কাফকা সেভাবে গল্প লিখতেন।”

আরও পড়ুন  মেসির জোড়া গোলে অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে নকআউটে আর্জেন্টিনা

ফ্রাঞ্জ কাফকার সাহিত্য যেমন পাঠককে ভাবায়, তেমনি মেসির ফুটবলও প্রতিনিয়ত নতুন বিস্ময়ের জন্ম দেয়। তাঁর ড্রিবলিং, পাস কিংবা গোলের মুহূর্তগুলো অনেক সময় যুক্তির সীমা ছাড়িয়ে যায়। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার সময় তিনি যেন মাঠে এক নতুন গল্প রচনা করেন।

রোজারিওর ধুলোমাখা গলি থেকে শুরু হওয়া মেসির যাত্রা ছিল সংগ্রামে ভরা। শৈশবে গ্রোথ হরমোনের সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে তিনি বার্সেলোনায় যোগ দেন। একটি সাধারণ ন্যাপকিনে লেখা চুক্তি পরবর্তীতে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়।

আরও পড়ুন  বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে নতুন চিন্তা, বিষধর প্রাণী নিয়ে সতর্ক জার্মান ফুটবলাররা

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। বার্সেলোনার হয়ে অসংখ্য শিরোপা, একের পর এক ব্যালন ডি’অর এবং অসংখ্য রেকর্ড গড়ে মেসি নিজেকে নিয়ে গেছেন সর্বকালের সেরাদের কাতারে। পেপ গার্দিওলার অধীনে ‘ফলস নাইন’ ভূমিকায় তিনি ফুটবলকে নতুন ভাষা উপহার দিয়েছিলেন।

তবে ব্যক্তিগত সাফল্যের ভিড়েও তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল বিশ্বকাপ। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, কিন্তু মেসির গল্প এখনও শেষ হয়নি। ফুটবল মাঠে তিনি এখনও এমন সব মুহূর্ত উপহার দেন, যা ভক্তদের মনে করিয়ে দেয়—কিছু মানুষ শুধু খেলেন না, তাঁরা শিল্প সৃষ্টি করেন। আর সেই শিল্পীদের তালিকায় লিওনেল মেসির নাম থাকবে চিরকাল।