যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম ভোটারদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল ছিল। তবে গাজা যুদ্ধ, ফিলিস্তিন ইস্যুতে দলটির অবস্থান এবং মুসলিমবিরোধী ঘটনার প্রতিক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষের কারণে সেই সমর্থন দ্রুত কমছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে—যদি অ্যান্ডি বার্নহাম ভবিষ্যতে লেবার পার্টির নেতৃত্ব নেন, তাহলে মুসলিম ভোটারদের আস্থা ছাড়া তিনি কি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন?
ব্রিটিশ লেখক, গবেষক এবং ফ্রেন্ডস অব আল-আকসার চেয়ারম্যান ইসমাইল প্যাটেলের মতে, মুসলিম ভোটারদের আস্থা হারানো লেবার পার্টির জন্য কেবল সাময়িক রাজনৈতিক সংকট নয়। এটি দলটির দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা। তাঁর মতে, শুধু প্রতীকী সৌজন্য নয়, বাস্তব নীতিগত পরিবর্তন ছাড়া মুসলিম ভোটারদের সমর্থন আর ফিরে আসবে না।
ইসমাইল প্যাটেল তাঁর মতামতধর্মী নিবন্ধে লিখেছেন, অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিশ্বাস পুনর্গঠন। মসজিদ সফর, ইফতারে অংশগ্রহণ কিংবা ঈদের শুভেচ্ছা জানানো দিয়ে এই সংকট কাটবে না। কারণ যে আস্থা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে ভেঙেছে, সেটি আবার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই ফিরিয়ে আনতে হবে।
এই আস্থা হারানোর বিষয়টি পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তরাজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ মুসলিম ভোটার লেবার পার্টিকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচনে সেই সমর্থন নেমে আসে প্রায় ৬০ শতাংশে। বিশেষ করে যেসব আসনে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা বেশি, সেখানে দলটির ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
নির্বাচনের ফলাফলও লেবারের জন্য উদ্বেগজনক ছিল। গাজার সমর্থনে প্রচারণা চালানো স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে লেবারের পাঁচজন এমপি পরাজিত হন। আরও কয়েকজন অল্প ব্যবধানে নিজেদের আসন ধরে রাখতে সক্ষম হন। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মুসলিম ভোটাররা আগের মতো একমুখীভাবে লেবারকে সমর্থন করছেন না।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মুসলিম ভোটারদের মধ্যে লেবার পার্টির সমর্থন আরও কমে প্রায় ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রতি পাঁচজন মুসলিম ভোটারের মধ্যে তিনজন এখন লেবারকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে স্বতন্ত্র প্রার্থী বা বিকল্প দলকে সমর্থন করতে প্রস্তুত।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু গাজা যুদ্ধ। কিয়ার স্টারমারের একটি মন্তব্য মুসলিম সমাজে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করে। তিনি একসময় বলেছিলেন, অবরুদ্ধ গাজায় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার অধিকার ইসরায়েলের রয়েছে। অনেক মুসলিম এটিকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত শাস্তির সমর্থন হিসেবে দেখেছেন।
এরপর আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) গাজায় গণহত্যার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও যুক্তরাজ্যের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। এই বিষয়টিও মুসলিম ভোটারদের অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দেয়।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, গাজায় যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি বাহিনীতে যোগ দেওয়া যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর তদন্ত শুরু হয়নি। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের পক্ষে শান্তিপূর্ণ সংহতি প্রকাশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নিষিদ্ধ হওয়ার পর দুই হাজার সাতশোর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, ধর্মীয় নেতা এবং সাধারণ নাগরিকও রয়েছেন। সমালোচকদের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করার অভিযোগে সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে।
ইসমাইল প্যাটেলের মতে, এসব পদক্ষেপ মুসলিমদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করেছে যে সরকার তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফলে লেবার পার্টির সঙ্গে মুসলিম সমাজের দূরত্ব আরও বেড়েছে।
শুধু বৈদেশিক নীতিই নয়, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধের ৪৫ শতাংশই মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থানে মুসলিমদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। পূর্ব সাসেক্সে একটি মসজিদে অগ্নিসংযোগ, ওয়ালসালে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক হামলা এবং এডিনবরায় মুসলিমদের ওপর ছুরিকাঘাতের মতো ঘটনা মুসলিম সমাজের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
লেখকের অভিযোগ, এসব ঘটনার পর সরকারের প্রতিক্রিয়া মূলত নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। দ্রুত তদন্ত, দৃশ্যমান রাজনৈতিক উদ্যোগ কিংবা জাতীয় পর্যায়ের জরুরি প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে সমান নাগরিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাগুলোকে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হামলার মতো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না।
ইসমাইল প্যাটেলের মতে, অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে এখনো সুযোগ রয়েছে এই আস্থাহীনতা কাটিয়ে ওঠার। তবে এজন্য তাঁকে প্রতীকী রাজনীতি ছেড়ে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি মনে করেন, প্রথমেই বার্নহামকে তাঁর উপদেষ্টা ও নীতিনির্ধারণী টিমে বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে হবে। যদি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে কেবল একপক্ষীয় অবস্থানের মানুষ থাকেন, তাহলে মুসলিম ভোটাররা শুরু থেকেই নেতিবাচক বার্তা পাবেন।
একই সঙ্গে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভিন্নমতকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক মতপ্রকাশকে গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন লেখক।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধে অংশ নেওয়া যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া উচিত। পাশাপাশি মসজিদে হামলার ঘটনাকেও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার মতোই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখকের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রকৃত প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে বসা। সরকারের পছন্দের সংগঠনের পরিবর্তে যেসব সংগঠনের ওপর মুসলিম সমাজের আস্থা রয়েছে, তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সহজ হবে না। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ৩৯ লাখ মুসলিম বাস করেন এবং বহু আসনে তাঁদের ভোট নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একই সঙ্গে মুসলিম ভোটারদের সামনে এখন আগের তুলনায় আরও বেশি রাজনৈতিক বিকল্প রয়েছে। গ্রিন পার্টি, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলো মুসলিম ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে লেবারের জন্য আগের মতো স্বয়ংক্রিয় সমর্থন পাওয়ার সুযোগ আর নেই।
ইসমাইল প্যাটেলের মতে, মুসলিম ভোটাররা এখন আর প্রতিশ্রুতির রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। তারা এখন দেখতে চান, কোনো রাজনৈতিক দল বাস্তবে কী করছে। অ্যান্ডি বার্নহাম যদি ভবিষ্যতে লেবার পার্টির নেতৃত্ব নেন, তাহলে তাঁর সফলতা নির্ভর করবে কথার চেয়ে কাজে মুসলিম ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেন কি না।




























