দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তরমন্তরে টানা প্রায় ১০ দিন ধরে শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবীদের এক ব্যতিক্রমী আন্দোলন চলছে। ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রা, কড়া পুলিশি নজরদারি এবং তীব্র তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে আন্দোলনকারীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের ঘোষণা, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন বন্ধ হবে না।
ভারতের মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই ঘটনার নৈতিক দায় সরকারের, বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রীর। তাই তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
নিজেদের ‘তেলাপোকা’ বলে পরিচয় দেওয়া এই আন্দোলনকারীরা মূলত ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’ নামে পরিচিত একটি অনলাইনভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্মের সদস্য। শুরুতে এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের একটি উদ্যোগ হলেও অল্প সময়েই তা তরুণদের বাস্তব আন্দোলনের রূপ নেয়।
যন্তরমন্তরে এখন সারাদিনই স্লোগান, বক্তব্য ও প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে। তীব্র গরমে কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, আবার কেউ গরম রাস্তার ওপর শুয়ে থেকেও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। চারদিকে ভারী ধাতব ব্যারিকেড বসিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে দিল্লি পুলিশ।
গত রোববার আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেন জলবায়ু আন্দোলনের পরিচিত মুখ সোনম ওয়াংচুক। তিনি বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেছেন। তাঁর উপস্থিতির পর আন্দোলনটি আরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মনোযোগ পেতে শুরু করেছে।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে ঘিরে। তিনি এক বক্তব্যে কিছু তরুণ, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন। পরে ব্যাখ্যা দিলেও সেই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে বহু তরুণ প্রতিবাদে যুক্ত হন।
এই ক্ষোভ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গঠন করেন। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে স্যুট পরা একটি তেলাপোকার লোগো তৈরি করেন, যা অল্প সময়েই তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
অভিজিৎ জানান, শুরুতে এটি কেবল ব্যঙ্গধর্মী একটি উদ্যোগ ছিল। কিন্তু লাখো তরুণ এতে যুক্ত হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, চাকরির সংকট, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বছরের পর বছর বিভিন্ন নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষা বাতিল হলেও এর দায় কেউ স্বীকার করছে না। তাই তরুণদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এই আন্দোলনকে দীর্ঘমেয়াদি রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইনস্টাগ্রামে সিজেপির অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটিরও বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এই বিশাল অনলাইন সমর্থন মাঠপর্যায়ে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবুও আন্দোলনের বিস্তার ইতোমধ্যে ভারতের একাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ৬ জুন যন্তরমন্তরে প্রথম কর্মসূচির পর আন্দোলনকারীরা ছয়টিরও বেশি শহরে বিক্ষোভ করেছেন। এরপর আবার রাজধানীতে ফিরে এসে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। তাঁদের দাবি, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগের দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি আন্দোলনকারীদের ‘বিভ্রান্তিকর শক্তির বি-টিম’ বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, দেশের অগ্রগতির প্রতি তাদের কোনো আস্থা নেই।
সরকার ইতোমধ্যে পুনরায় নিট-ইউজি পরীক্ষা আয়োজন করলেও আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ কমেনি। তাঁদের অভিযোগ, শুধু পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া নয়, বরং পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
বিক্ষোভস্থলে একটি স্মরণ দেয়ালে সেই শিক্ষার্থীদের ছবি ও নাম রাখা হয়েছে, যাদের পরিবারের দাবি, পরীক্ষা বাতিলের পর মানসিক চাপে তারা আত্মহত্যা করেছেন। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, এই দেয়াল তাদের আন্দোলনের নৈতিক শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
প্রতিদিন অসংখ্য সাধারণ মানুষ আন্দোলনকারীদের জন্য খাবার ও পানি পাঠাচ্ছেন। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, নাগরিক সমাজ ও স্বেচ্ছাসেবীরাও সংহতি প্রকাশ করছেন। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে যন্তরমন্তরে মানুষের উপস্থিতি আরও বেড়ে যায়।
আন্দোলনের মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ তাঁদের তাৎক্ষণিক দাবি হলেও মূল লক্ষ্য আরও বড়। তাঁর ভাষায়, তারা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চান, যেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষার্থীকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে স্বপ্ন হারাতে হবে না।



























