যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব বাতিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে বড় ধাক্কা দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আদালত রায়ে স্পষ্ট করেছে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার এবং কেবল নির্বাহী আদেশ দিয়ে তা পরিবর্তন করা যাবে না। এরপর প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প চাইলে কংগ্রেসের মাধ্যমে কি এই আইন পরিবর্তন করতে পারবেন?
স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার ৬-৩ ভোটে দেওয়া রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী আদেশ কার্যকর করার পথ বন্ধ করে দেয়। বিচারপতিরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করেছে এবং সেটি প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার আওতায় পরিবর্তনযোগ্য নয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। সেখানে বলা হয়, যেসব শিশুর বাবা-মা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা নন কিংবা অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, তাঁদের সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাবে না।
একই আদেশে আরও বলা হয়েছিল, পর্যটক, শিক্ষার্থী বা অস্থায়ী কর্মভিসায় থাকা বিদেশিদের সন্তানদের ক্ষেত্রেও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব প্রযোজ্য হবে না। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, বর্তমান ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, কোনো শিশুর বাবা-মায়ের অভিবাসন মর্যাদা যাই হোক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে জন্ম নিলে সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই নীতিকে বলা হয় জুস সোলি বা ভূমির অধিকারভিত্তিক নাগরিকত্ব।
এর বিপরীতে রয়েছে জুস স্যাঙ্গুইনিস , যেখানে নাগরিকত্ব নির্ধারিত হয় বাবা-মায়ের জাতীয়তার ভিত্তিতে। বিশ্বের অনেক দেশ এই নীতিই অনুসরণ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই জন্মস্থানভিত্তিক নাগরিকত্ব বহাল রেখেছে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে বলেন, চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মানুষের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল। আদালত সেই সাংবিধানিক অঙ্গীকারই পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এই রায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদ্যাপনের ঠিক আগে এসেছে। অনেক সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞের মতে, এটি শুধু একটি অভিবাসনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নয়; বরং মার্কিন নাগরিকত্বের মৌলিক ধারণাকে আবারও স্পষ্ট করেছে।
চতুর্দশ সংশোধনী ১৮৬৮ সালে গৃহীত হয়। গৃহযুদ্ধের পর দাসপ্রথার অবসান এবং আফ্রিকান-আমেরিকানদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য এই সংশোধনী যুক্ত করা হয়েছিল।
সংশোধনীতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা নাগরিকত্বপ্রাপ্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের অধীন সব ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের নাগরিক। এই ধারার ব্যাখ্যাই দীর্ঘদিন ধরে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেন, এত দিন এই ধারার ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাঁদের দাবি ছিল, “যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের অধীন” কথাটির অর্থ হলো কিছু অভিবাসী গোষ্ঠী স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই সুবিধার বাইরে থাকবে।
প্রশাসনের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল জন সাওয়ার বলেন, কেবল তাঁদের সন্তানদের নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত, যাঁদের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি স্থায়ী আনুগত্য রয়েছে। তাঁর মতে, অস্থায়ী ভিসাধারী বা অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই সুবিধা প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সুযোগ নিয়ে অনেক বিদেশি শুধুমাত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছেন। তাঁর ভাষায়, এতে করদাতাদের অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি আরও দাবি করেন, তথাকথিত “বার্থ ট্যুরিজম” যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এ কারণেই তিনি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বর্তমান নীতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছিলেন।
তবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্প বলেন, এটি দেশের জন্য ভালো হয়নি। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা চাইলে নতুন আইন এনে এই নীতিতে পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের মতো ব্যয়বহুল ও অন্যায্য নীতির অবসান ঘটাতে কংগ্রেসের এখনই উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তিনি এ ধরনের যেকোনো প্রচেষ্টায় পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দেন।
কিন্তু সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের বড় অংশই মনে করছেন, শুধু কংগ্রেসে আইন পাস করলেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিল করা সম্ভব নয়। কারণ এটি একটি সাধারণ আইন নয়, সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত সাংবিধানিক অধিকার।
ইতালির ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের গবেষক রাইনার বাউবকের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর কংগ্রেসের সাধারণ আইন করে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, যদি এ নীতি পরিবর্তন করতেই হয়, তাহলে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী সংশোধন করতে হবে। আর যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন এবং রাজনৈতিকভাবে প্রায় অসম্ভব।
সংবিধান সংশোধনের জন্য কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়। এরপর অন্তত তিন-চতুর্থাংশ অঙ্গরাজ্যের অনুমোদনও লাগবে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় রিপাবলিকানদের পক্ষে এমন সমর্থন পাওয়া প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে শুধু কংগ্রেসে বিল পাস করলেই বিষয়টি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসন বিশেষজ্ঞ নান্দো সিগোনা বলেন, কংগ্রেস যদি সাধারণ আইনও পাস করে, সেটি তাৎক্ষণিকভাবে সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
তাঁর মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় আবারও প্রমাণ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্বের সীমা নির্ধারণ করে সংবিধান, প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা নয়।
এডিনবরা ল স্কুলের প্রধান জো শ বলেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গৃহযুদ্ধ, দাসপ্রথা বিলোপ এবং কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ছাড়া বিষয়টি বোঝা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ১৮৬৮ সালের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া মানুষের নাগরিকত্ব সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। ফলে এটি অনেকের কাছে মার্কিন জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি।
গবেষকদের মতে, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ কার্যকর হলে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার শিশু জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হতো। দীর্ঘমেয়াদে এতে নাগরিকত্বহীন মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারত।
মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট ও পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৪৫ সালের মধ্যে অনথিভুক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারত।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতেন লাতিনো অভিবাসী পরিবারগুলো। একই সঙ্গে এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও নাগরিকত্বহীন শিশুদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা ছিল।
সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া মানুষেরা আগামী কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের অবদান রাখবেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নাগরিকত্ব নিশ্চিত হলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও কর প্রদানের সুযোগ বাড়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে দেশটির অর্থনীতিও লাভবান হয়।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৫৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ট্রাম্পের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন। সমর্থন জানিয়েছেন ৪৩ শতাংশ।
বিশ্বের অন্তত ৩০টি দেশে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিধান রয়েছে। কানাডা, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা এ তালিকায় রয়েছে। তবে কিছু দেশে অস্থায়ীভাবে অবস্থানকারী বিদেশিদের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই সুবিধা সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি দেশের ইতিহাস, সংবিধান ও অভিবাসন নীতি আলাদা হওয়ায় জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়মও এক নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাকে অন্য দেশের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা সব সময় সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায় স্পষ্ট করে দিয়েছে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রে কেবল একটি নীতি নয়; এটি সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত মৌলিক অধিকার। ফলে ট্রাম্প বা ভবিষ্যতের কোনো প্রেসিডেন্ট চাইলে শুধু নির্বাহী আদেশ বা সাধারণ আইন করে এই অধিকার বাতিল করতে পারবেন না। যদি কখনও এ নীতিতে পরিবর্তন আনতেই হয়, তাহলে তার একমাত্র কার্যকর পথ হবে সংবিধান সংশোধন—যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত কঠিন এবং প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন অধিকাংশ সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ।

























