মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ দেশ লেবাননের দক্ষিণ অঞ্চলে ইসরাইলি বিমান বাহিনীর এক ভয়াবহ হামলায় অন্তত পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন। মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননের টাইর জেলার মাজদাল জাউন নামক শহরে এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনাটি ঘটে। কাতার ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে এই মর্মান্তিক খবরটি বিশ্ববাসীকে জানিয়েছে। এই হামলায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সম্মুখ সারির মানবিক সেবাকর্মীদের প্রাণহানি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, নিহতদের মধ্যে তিনজনই পেশাদার স্বাস্থ্যকর্মী। জানা গেছে, ইসরাইলের এর আগের একটি পৃথক হামলার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধার করতে তারা সেখানে গিয়েছিলেন।
উদ্ধারকাজ চলাকালীন ইসরাইলি যুদ্ধবিমান থেকে পুনরায় হামলা চালানো হলে এই জীবন রক্ষাকারী কর্মীরা ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে দেখছেন অনেক মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয় প্রশাসন। মজদাল জাউন শহরের ওই যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় উদ্ধারকারী দলের সাথে থাকা লেবানিজ সেনাবাহিনীর দুই সদস্যও এই হামলায় আহত হয়েছেন। ইসরাইল সীমান্তের অত্যন্ত কাছে অবস্থিত এই জেলাটি দীর্ঘকাল ধরে সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্ধার কাজ চলাকালীন হামলার কারণে সেখানে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। আহত সেনাদের দ্রুত উদ্ধার করে নিকটস্থ সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর এই ধরণের আক্রমণ লেবাননের স্বাস্থ্য ও সেবা খাতের জন্য এক বিশাল ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই অন্যায় হামলার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ জানাবে। জীবন বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দেওয়ার এই ঘটনা লেবাননের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনার ফলে সাধারণ মানুষ এখন প্রতিনিয়ত জীবন ও সম্পদের ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। গত কয়েক মাস ধরে ইসরাইল ও লেবানন সীমান্তে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননের গ্রামগুলোতে ইসরাইলি নজরদারি ও বিমান হামলা এখন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো বলছে, এই সংঘাতের ফলে লেবাননের কয়েক হাজার মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। আজকের এই হামলা সেই চলমান উত্তেজনারই একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হলেও সীমান্ত এলাকায় কামানের গর্জন ও বিমান হামলা বন্ধ হচ্ছে না। মাজদাল জাউনের বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে, ইসরাইলি ড্রোন ও যুদ্ধবিমানগুলো আকাশে প্রতিনিয়ত টহল দিচ্ছে। উদ্ধারকারী দলের ওপর হামলা চালানোর মাধ্যমে মানবিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার পথকেও রুদ্ধ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতির কারণে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করা এখন আরও বেশি কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
লেবাননের সরকার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও বলছে যে, কোনো যুদ্ধ ক্ষেত্রেই চিকিৎসক বা উদ্ধারকর্মীদের ওপর হামলা চালানো নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। মাজদাল জাউনের এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। শান্তি আলোচনার মাধ্যমে এই অস্থিরতা নিরসনের দাবি এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
পরিশেষে, লেবাননের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি যারা নিঃস্বার্থভাবে সেবা দিচ্ছিলেন, তারাও আজ টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। আল জাজিরা জানিয়েছে, ওই এলাকায় এখনও উদ্ধার অভিযান সীমিত পরিসরে অব্যাহত রয়েছে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে পূর্ণাঙ্গ উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অশান্ত পরিবেশ প্রশমনে বিশ্বনেতাদের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।



























