ঢাকা ০৩:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

ডায়াবেটিস না থাকলেও খাবারের পর রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ জরুরি

স্বাস্থ্যকর খাবার রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ শুধু ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নয়, সুস্থ মানুষের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন, ডায়াবেটিস না থাকলে খাবারের পর রক্তে শর্করা বাড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, নিয়মিত অতিরিক্ত শর্করা বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, কিডনি জটিলতা ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

খাবার খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কিছুটা বাড়া স্বাভাবিক। তবে অতিরিক্ত পরিমাণে মিষ্টিজাতীয় খাবার, কোমল পানীয়, পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট বা অতিভোজন করলে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। শরীর তখন ইনসুলিনের মাধ্যমে সেই শর্করা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু দীর্ঘদিন একই অবস্থা চলতে থাকলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের ধরন ও খাওয়ার সময় রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একবারে বেশি খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার খেলে শরীরে হঠাৎ করে অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রবেশ করে না। একই সঙ্গে খাবারের প্লেটে পর্যাপ্ত শাকসবজি, আঁশযুক্ত খাবার, প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখলে শর্করা ধীরে ধীরে রক্তে মিশে এবং দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায়।

অনেকেই শুধু ক্যালোরির দিকে নজর দেন, কিন্তু খাবারের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI)গ্লাইসেমিক লোড (GL)-এর বিষয়টি উপেক্ষা করেন। কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার যেমন ওটস, লাল চাল, ডাল, ছোলা, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি এবং বেশিরভাগ ফল রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়তে দেয় না। অন্যদিকে সাদা পাউরুটি, কেক, বিস্কুট, মিষ্টি ও কোমল পানীয় দ্রুত শর্করা বাড়িয়ে দেয়।

খাবারের পর ১০ থেকে ২০ মিনিট হাঁটার অভ্যাসও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর। হালকা হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রমের ফলে শরীর অতিরিক্ত গ্লুকোজ দ্রুত ব্যবহার করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার বা হালকা ব্যায়াম করলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও কমে।

পর্যাপ্ত ঘুমও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম না হলে শরীরে কর্টিসলসহ বিভিন্ন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। একইভাবে দীর্ঘদিন মানসিক চাপ থাকলেও শরীরে স্ট্রেস হরমোন বেড়ে গিয়ে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণও শরীরের ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। তাই সুস্থ থাকতে এসব অভ্যাস থেকে দূরে থাকা জরুরি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীরের বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে এবং অতিরিক্ত গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ বা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। বছরে অন্তত একবার রক্তে শর্করা পরীক্ষা করলে ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব। প্রি-ডায়াবেটিস অবস্থায় প্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার পরিবর্তন আনতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায়।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, শুধু চিনি কম খেলেই হবে না; প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্টফুড এবং অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবারও কমাতে হবে। এর পরিবর্তে তাজা ফল, সবজি, ডাল, বাদাম, মাছ এবং পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শিশুদের ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুললে ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমে।

সবশেষে বলা যায়, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কেবল ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নয়, বরং সুস্থ জীবনধারা বজায় রাখতে সবার জন্যই প্রয়োজন। সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—এই কয়েকটি অভ্যাস অনুসরণ করলেই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করা সম্ভব। ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে আপনাকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

এইচএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রে অভিভাবকদের জন্য নতুন ব্যবস্থা, বোর্ডের নির্দেশ

ডায়াবেটিস না থাকলেও খাবারের পর রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ জরুরি

Update Time : ১২:১৮:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ শুধু ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নয়, সুস্থ মানুষের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন, ডায়াবেটিস না থাকলে খাবারের পর রক্তে শর্করা বাড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, নিয়মিত অতিরিক্ত শর্করা বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, কিডনি জটিলতা ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

খাবার খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কিছুটা বাড়া স্বাভাবিক। তবে অতিরিক্ত পরিমাণে মিষ্টিজাতীয় খাবার, কোমল পানীয়, পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট বা অতিভোজন করলে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। শরীর তখন ইনসুলিনের মাধ্যমে সেই শর্করা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু দীর্ঘদিন একই অবস্থা চলতে থাকলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের ধরন ও খাওয়ার সময় রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একবারে বেশি খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার খেলে শরীরে হঠাৎ করে অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রবেশ করে না। একই সঙ্গে খাবারের প্লেটে পর্যাপ্ত শাকসবজি, আঁশযুক্ত খাবার, প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখলে শর্করা ধীরে ধীরে রক্তে মিশে এবং দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায়।

আরও পড়ুন  কাদের চিয়া সিড খাওয়া উচিত নয় | চিকিৎসকের সতর্কতা ও সঠিক নিয়ম

অনেকেই শুধু ক্যালোরির দিকে নজর দেন, কিন্তু খাবারের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI)গ্লাইসেমিক লোড (GL)-এর বিষয়টি উপেক্ষা করেন। কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার যেমন ওটস, লাল চাল, ডাল, ছোলা, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি এবং বেশিরভাগ ফল রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়তে দেয় না। অন্যদিকে সাদা পাউরুটি, কেক, বিস্কুট, মিষ্টি ও কোমল পানীয় দ্রুত শর্করা বাড়িয়ে দেয়।

খাবারের পর ১০ থেকে ২০ মিনিট হাঁটার অভ্যাসও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর। হালকা হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রমের ফলে শরীর অতিরিক্ত গ্লুকোজ দ্রুত ব্যবহার করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার বা হালকা ব্যায়াম করলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও কমে।

আরও পড়ুন  ক্যান্সার হওয়ার আগে শরীর যে সংকেত দেয়

পর্যাপ্ত ঘুমও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম না হলে শরীরে কর্টিসলসহ বিভিন্ন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। একইভাবে দীর্ঘদিন মানসিক চাপ থাকলেও শরীরে স্ট্রেস হরমোন বেড়ে গিয়ে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণও শরীরের ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। তাই সুস্থ থাকতে এসব অভ্যাস থেকে দূরে থাকা জরুরি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীরের বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে এবং অতিরিক্ত গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ বা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। বছরে অন্তত একবার রক্তে শর্করা পরীক্ষা করলে ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব। প্রি-ডায়াবেটিস অবস্থায় প্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার পরিবর্তন আনতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায়।

আরও পড়ুন  হামের উপসর্গ: শিশু মৃত্যু ও আক্রান্তের নতুন তথ্য

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, শুধু চিনি কম খেলেই হবে না; প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্টফুড এবং অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবারও কমাতে হবে। এর পরিবর্তে তাজা ফল, সবজি, ডাল, বাদাম, মাছ এবং পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শিশুদের ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুললে ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমে।

সবশেষে বলা যায়, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কেবল ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নয়, বরং সুস্থ জীবনধারা বজায় রাখতে সবার জন্যই প্রয়োজন। সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—এই কয়েকটি অভ্যাস অনুসরণ করলেই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করা সম্ভব। ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে আপনাকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।