ভারত-শ্রীলঙ্কা টেস্টের শেষ দিনটা গলে যেন হঠাৎ করেই রোমাঞ্চকর হয়ে উঠল। জয়ের জন্য ভারতের দেওয়া ৩৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শ্রীলঙ্কা পঞ্চম দিনের শুরুতে ৪ উইকেটে ৮৪ রান নিয়ে খেলতে নামে। সকালের সেশন পেরিয়ে স্বাগতিকদের স্কোর দাঁড়ায় ৬ উইকেটে ১৭৫। তখনও মনে হচ্ছিল, ম্যাচের শেষটা হয়তো লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই হবে। কিন্তু দ্বিতীয় সেশনে মাত্র কয়েকটি ওভারেই বদলে যায় পুরো চিত্র। ৭৫ ওভার শেষে শ্রীলঙ্কার স্কোর ছিল ৬ উইকেটে ১৯৯ রান। এরপরই বল হাতে ঝড় তোলেন ভারতের তরুণ বাঁহাতি স্পিনার মানভ সুতার। তাঁর দুর্দান্ত স্পেলে মাত্র ১৬ বলের মধ্যে শেষ চারটি উইকেট হারিয়ে ২০৬ রানে অলআউট হয় শ্রীলঙ্কা। ফলে ১৬৫ রানের জয় পায় ভারত।
শেষ দিনের নাটকীয়তায় সবচেয়ে বড় চরিত্র হয়ে উঠেছেন সুতার। তাঁর এক ওভারের প্রথম দুই বলেই প্রবাত জয়াসুরিয়া ও সোনাল দিনুশাকে ফেরান তিনি। ওভারের শেষ বলে লাহিরু কুমারাকেও ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভারতের হাতে তুলে দেন। পরের ওভারে ফিরে কেশারা নুয়ানথাকেও সাজঘরে পাঠান এই বাঁহাতি স্পিনার। মাত্র ১৬ বলের ব্যবধানে চার উইকেট নিয়ে শ্রীলঙ্কার প্রতিরোধের শেষটুকুও ভেঙে দেন তিনি। এই ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট—দুই ইনিংস মিলিয়ে সুতারের শিকার ১০ উইকেট। ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই এমন কীর্তি তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এর আগে গত জুনে আফগানিস্তানের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টে ৭ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি।
শ্রীলঙ্কার হয়ে শেষ পর্যন্ত লড়াইটা ধরে রেখেছিলেন সোনাল দিনুশা। আগের দিন ২৫ রানে অপরাজিত থাকা এই বাঁহাতি ব্যাটার আজ ধননঞ্জয়া ডি সিলভার সঙ্গে পঞ্চম উইকেটে গড়েন ৯৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। ধননঞ্জয়া ৫৯ রান করে ফিরে যাওয়ার পরও হাল ছাড়েননি দিনুশা। এরপর কেশারা নুয়ানথাকে সঙ্গে নিয়ে ম্যাচ বাঁচানোর চেষ্টা করেন তিনি। সপ্তম উইকেটে দুজনের জুটি দাঁড়ায় ৪৩ রানে। কিন্তু সুতারের বলে লেগ স্লিপে ক্যাচ দিয়ে দিনুশার বিদায়ই যেন শ্রীলঙ্কার পতনের সংকেত হয়ে আসে। ৮৪ রানের ইনিংস খেলে তিনি ফিরতেই দ্রুত চার উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় স্বাগতিক দল। ভারতের বোলিংয়ের সামনে শেষ পর্যন্ত তাদের লড়াই থেমে যায় ২০৬ রানে।
ভারতের এই জয় আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে ম্যাচটির ঐতিহাসিক অবস্থানের কারণে। গলের এই ম্যাচটি ছিল ভারতের ৬০০তম টেস্ট। সেই মাইলফলকের ম্যাচেই জয় তুলে নিয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল শুবমান গিলের দল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বড় মঞ্চে ভারতের এই সাফল্য সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে আইসিসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে। ভারতের ৬০০তম টেস্টের জয় তাই শুধু সিরিজের হিসাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, দলের নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাসের জন্যও বড় বার্তা। বিশেষ করে সুতারের মতো তরুণ ক্রিকেটারের এমন পারফরম্যান্স ভারতের ভবিষ্যৎ টেস্ট দল নিয়ে আশাবাদ তৈরি করছে।
জয়ের পর অধিনায়ক শুবমান গিলও সুতারের প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। তাঁর মতে, ভারতে অভিষেক ম্যাচ থেকেই সুতারকে সম্ভাবনাময় মনে হয়েছে এবং এই ম্যাচেও তিনি সেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন। দীর্ঘ সময় ভারতের হয়ে খেলার সামর্থ্য এই তরুণ স্পিনারের আছে বলেও মনে করেন গিল। ভারতের ক্রিকেটের সর্বশেষ ম্যাচ, দল ও ফলাফল জানতে বিসিসিআইয়ের অফিসিয়াল ম্যাচ সেন্টার দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে এই সিরিজের শ্রীলঙ্কার দিকের খবর ও ম্যাচ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাবে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে। তরুণ ক্রিকেটারদের সামনে রেখে এই জয় ভারতের টেস্ট পরিকল্পনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে হারের পর শ্রীলঙ্কা অধিনায়ক ধননঞ্জয়া ডি সিলভা গলের চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিংয়ের কঠিন বাস্তবতার কথাই তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, ভারত টস জিতে প্রথমে ভালো রান তুলতে পেরেছে এবং পরে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিংয়ে উইকেট পড়তে থাকায় চাপ বাড়তে থাকে। রাহুল ও দেবদত্ত পাড়িক্কালের ভালো শুরুও ভারতের জন্য বড় সুবিধা তৈরি করেছে বলে মনে করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ আর সামলাতে পারেনি স্বাগতিকরা। ভারত-শ্রীলঙ্কা টেস্টের প্রথম ম্যাচে তাই একদিকে সুতারের ১০ উইকেট, অন্যদিকে ভারতের ৬০০তম টেস্টে জয়—দুই ঘটনাই আলাদা করে মনে রাখার মতো হয়ে থাকল। দুই ম্যাচের সিরিজে এখন সামনে দ্বিতীয় টেস্ট; সেখানে শ্রীলঙ্কা ঘুরে দাঁড়াতে পারে কি না, নাকি ভারত সিরিজ জিতে নেয়—সেটিই দেখার বিষয়।



























