ঢাকা ১২:০১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিরোধীদের ওয়াকআউটের মধ্যেই গুম ও মানবাধিকার কমিশন বিল পাস

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ১১:০৪:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫১২

বিরোধী দলের আপত্তি ও ওয়াকআউটের মধ্যেই জাতীয় সংসদে গুম প্রতিরোধ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল পাস হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ওয়াকআউটের মধ্যেই জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সংসদে বিল দুটি আলাদাভাবে কণ্ঠভোটে পাস করা হয়।
বিল পাসের আগে বিরোধী দলের সদস্যরা প্রস্তাবিত আইনের কয়েকটি বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।
একই অধিবেশনে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-ও পাস হয়েছে।

নতুন গুম প্রতিরোধ আইনে জোরপূর্বক গুমকে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
গুম হওয়া ব্যক্তি মারা গেলে বা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
একই সঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের মাধ্যমে ২০০৯ সালের বিদ্যমান আইন বাতিল করে নতুন আইনি কাঠামো তৈরির কথা বলা হয়েছে।
নতুন কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকার বিধান রাখা হয়েছে।
কমিশনারদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রাখার কথা রয়েছে।
সরকার বলছে, এর মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশনকে আরও কার্যকর ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে।

তবে বিরোধী দলের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলোর তুলনায় নতুন বিল দুটি দুর্বল করা হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে বলেন, আপত্তি জানানো সত্ত্বেও তাদের উদ্বেগ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রক্রিয়া রাখার বিষয়েও আপত্তি তোলা হয়।
এ কারণেই বিরোধী সদস্যরা বিল পাসের প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।

অন্যদিকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তার দাবি, নতুন মানবাধিকার কমিশন আইন আগের তুলনায় দুর্বল নয়, বরং আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে কমিশনের কার্যক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বিলটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনাতেও শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করবে বলে দাবি করেন আইনমন্ত্রী।

গুম প্রতিরোধ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলটি উত্থাপন ও পাসের জন্য সংসদে প্রস্তাব করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
এর আগে বিল দুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল।
তবে কমিটির যাচাই প্রক্রিয়া নিয়েও বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানিয়েছিলেন।

সংসদীয় কমিটির আলোচনার সময়ও বিরোধীরা দাবি করেছিল, বিল পর্যালোচনার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি।
তারা গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব, মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জবাবদিহির মতো কয়েকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
সরকার অবশ্য বলছে, নতুন আইন গুম প্রতিরোধের পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের প্রতিকার পাওয়ার পথও শক্তিশালী করবে।
ফলে বিল দুটি পাস হলেও এর বিভিন্ন ধারা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।

গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতি ও নাগরিক অধিকারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর তদন্ত, বিচার এবং মানবাধিকার কমিশনের বাস্তব ভূমিকা কেমন হয়, সেদিকে নজর থাকবে।
বিশেষ করে গুমের ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহি এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতিকার নিশ্চিত করা বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
আইনের বাস্তব প্রয়োগই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে নতুন কাঠামো মানবাধিকার সুরক্ষায় কতটা কার্যকর হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিরোধীদের ওয়াকআউটের মধ্যেই গুম ও মানবাধিকার কমিশন বিল পাস

Update Time : ১১:০৪:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ওয়াকআউটের মধ্যেই জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সংসদে বিল দুটি আলাদাভাবে কণ্ঠভোটে পাস করা হয়।
বিল পাসের আগে বিরোধী দলের সদস্যরা প্রস্তাবিত আইনের কয়েকটি বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।
একই অধিবেশনে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-ও পাস হয়েছে।

নতুন গুম প্রতিরোধ আইনে জোরপূর্বক গুমকে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
গুম হওয়া ব্যক্তি মারা গেলে বা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
একই সঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের মাধ্যমে ২০০৯ সালের বিদ্যমান আইন বাতিল করে নতুন আইনি কাঠামো তৈরির কথা বলা হয়েছে।
নতুন কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকার বিধান রাখা হয়েছে।
কমিশনারদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রাখার কথা রয়েছে।
সরকার বলছে, এর মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশনকে আরও কার্যকর ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন  সংসদে ১০ স্থায়ী কমিটি, দায়িত্ব পেলেন যারা

তবে বিরোধী দলের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলোর তুলনায় নতুন বিল দুটি দুর্বল করা হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে বলেন, আপত্তি জানানো সত্ত্বেও তাদের উদ্বেগ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রক্রিয়া রাখার বিষয়েও আপত্তি তোলা হয়।
এ কারণেই বিরোধী সদস্যরা বিল পাসের প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।

আরও পড়ুন  চট্টগ্রামে এলডিপি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন সহস্রাধিক নেতাকর্মী।

অন্যদিকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তার দাবি, নতুন মানবাধিকার কমিশন আইন আগের তুলনায় দুর্বল নয়, বরং আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে কমিশনের কার্যক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বিলটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনাতেও শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করবে বলে দাবি করেন আইনমন্ত্রী।

গুম প্রতিরোধ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলটি উত্থাপন ও পাসের জন্য সংসদে প্রস্তাব করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
এর আগে বিল দুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল।
তবে কমিটির যাচাই প্রক্রিয়া নিয়েও বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানিয়েছিলেন।

সংসদীয় কমিটির আলোচনার সময়ও বিরোধীরা দাবি করেছিল, বিল পর্যালোচনার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি।
তারা গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব, মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জবাবদিহির মতো কয়েকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
সরকার অবশ্য বলছে, নতুন আইন গুম প্রতিরোধের পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের প্রতিকার পাওয়ার পথও শক্তিশালী করবে।
ফলে বিল দুটি পাস হলেও এর বিভিন্ন ধারা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।

আরও পড়ুন  রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে OIC-এর সমর্থন চাইলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতি ও নাগরিক অধিকারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর তদন্ত, বিচার এবং মানবাধিকার কমিশনের বাস্তব ভূমিকা কেমন হয়, সেদিকে নজর থাকবে।
বিশেষ করে গুমের ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহি এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতিকার নিশ্চিত করা বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
আইনের বাস্তব প্রয়োগই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে নতুন কাঠামো মানবাধিকার সুরক্ষায় কতটা কার্যকর হচ্ছে।