হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনায় থাকা একটি সম্ভাব্য চুক্তি কার্যকর হলে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর ইরানের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে এখনো চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়নি এবং এর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক আঞ্চলিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোকে ইরানের জলসীমা ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে জাহাজ চলাচল তদারকি এবং সম্ভাব্য ফি আদায়ের ক্ষেত্রে তেহরানের ভূমিকা বাড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন ব্যবস্থা কার্যকর হলে এটি ইরানের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বা নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
আলোচনার অংশ হিসেবে ইরান ও ওমান প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। ভৌগোলিকভাবে হরমুজ প্রণালির উত্তরাংশ ইরানের এবং দক্ষিণাংশ ওমানের নিয়ন্ত্রণে। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে চুক্তির সব শর্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়ার বিষয়ে দ্রুত সমঝোতা হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আগেই জানিয়েছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে চলে যাওয়ার বিষয়ে ওয়াশিংটন সম্মত নয়। সম্ভাব্য চুক্তি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের একটি হলো জাহাজ থেকে ফি আদায়। ইরানের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের পণ্যমূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি নেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে ওমানের প্রস্তাব প্রায় ৩ শতাংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক ফি আরোপের বিরোধিতা করছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয় হলো, উপসাগরে প্রবেশকারী ও বের হওয়া জাহাজের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে ভাগ হবে। ইরান প্রবেশকারী জাহাজের ওপর বেশি নিয়ন্ত্রণ চাইলেও উপসাগরীয় দেশগুলো চায়, জাহাজ তল্লাশি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব বজায় থাকুক এবং বাণিজ্যে অতিরিক্ত বাধা সৃষ্টি না হোক।
একই সময়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উত্তেজনাপূর্ণ। ইরান সতর্ক করে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে তাদের ভূখণ্ডে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ শুধু একটি আঞ্চলিক ইস্যু নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইরান-ওমানের সম্ভাব্য চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া—সবকিছুই আগামী দিনগুলোতে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বিশ্ব।
এ মুহূর্তে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে, তা জানতে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।



























