ঢাকা ০১:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

নীতি সুদহার কমল, মূল্যস্ফীতি কি আরও বাড়বে?

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ১১:৪০:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫১০

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

নীতি সুদহার কমল। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ)-এর হারও ১১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশে নামানো হয়েছে। তবে এমন সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশে মূল্যস্ফীতি এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই সিদ্ধান্তে কি মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে?

অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, নীতি সুদহার কমলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ কমে যায়। এতে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বেশি ঋণ নিতে উৎসাহিত হয়। ঋণের প্রবাহ বাড়লে বাজারে অর্থের সরবরাহও বৃদ্ধি পায়। মানুষের ব্যয় বাড়ার ফলে পণ্য ও সেবার চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। জুনে তা কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এলেও সাম্প্রতিক বন্যার কারণে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু নীতি সুদহার কমানো মানেই মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কারণ মূল্যস্ফীতি নির্ভর করে আরও অনেক বিষয়ের ওপর। যেমন খাদ্যপণ্যের সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম, বিনিময় হার, সরকারি ব্যয় এবং ব্যাংকিং খাতে ঋণ প্রবাহের বাস্তব চিত্র।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, রিজার্ভ মানি ও ব্রড মানি—দুই সূচকই বেড়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি ছিল ২১ দশমিক ৭৪ শতাংশ, আর ব্রড মানির প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। সাধারণভাবে রিজার্ভ মানি বাড়লে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ সৃষ্টির সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যা ভবিষ্যতে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে সরকার বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর একটি অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হবে। যদি এই অর্থ নতুনভাবে অর্থনীতিতে প্রবেশ করে এবং দ্রুত ঋণ হিসেবে বিতরণ হয়, তাহলে বাজারে অর্থের প্রবাহ আরও বাড়তে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে ঋণের চাহিদা, বিতরণের গতি এবং উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর।

এদিকে ব্যাংকিং খাতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমানতের প্রকৃত সুদহার। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে আমানতের সুদের হার কম থাকায় প্রকৃত সুদ ঋণাত্মক হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক মানুষ ব্যাংকে সঞ্চয় করার পরিবর্তে নগদ অর্থ বা বিকল্প বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন। এতে ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধিও চাপের মুখে পড়ছে।

একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়ায় এক ধরনের ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট তৈরি হয়েছে। ফলে সুদহার কমলেও বেসরকারি খাতে প্রত্যাশিত হারে ঋণপ্রবাহ বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

সব মিলিয়ে, নীতি সুদহার কমল বলে মূল্যস্ফীতি অবশ্যই বেড়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না। তবে যদি বাজারে অর্থের সরবরাহ দ্রুত বাড়ে, খাদ্য সরবরাহে সংকট অব্যাহত থাকে এবং উৎপাদন সেই হারে না বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নত হলে সুদহার কমানোর ইতিবাচক প্রভাবও দেখা যেতে পারে।

কঙ্গনা রানৌতের বিস্ফোরক মন্তব্যে নতুন বিতর্ক, পকেটমার কাকে বললেন

নীতি সুদহার কমল, মূল্যস্ফীতি কি আরও বাড়বে?

Update Time : ১১:৪০:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

নীতি সুদহার কমল। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ)-এর হারও ১১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশে নামানো হয়েছে। তবে এমন সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশে মূল্যস্ফীতি এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই সিদ্ধান্তে কি মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে?

অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, নীতি সুদহার কমলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ কমে যায়। এতে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বেশি ঋণ নিতে উৎসাহিত হয়। ঋণের প্রবাহ বাড়লে বাজারে অর্থের সরবরাহও বৃদ্ধি পায়। মানুষের ব্যয় বাড়ার ফলে পণ্য ও সেবার চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। জুনে তা কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এলেও সাম্প্রতিক বন্যার কারণে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন  জ্বালানি সংকট প্রভাব: জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি বিশ্লেষণ

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু নীতি সুদহার কমানো মানেই মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কারণ মূল্যস্ফীতি নির্ভর করে আরও অনেক বিষয়ের ওপর। যেমন খাদ্যপণ্যের সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম, বিনিময় হার, সরকারি ব্যয় এবং ব্যাংকিং খাতে ঋণ প্রবাহের বাস্তব চিত্র।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, রিজার্ভ মানি ও ব্রড মানি—দুই সূচকই বেড়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি ছিল ২১ দশমিক ৭৪ শতাংশ, আর ব্রড মানির প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। সাধারণভাবে রিজার্ভ মানি বাড়লে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ সৃষ্টির সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যা ভবিষ্যতে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

আরও পড়ুন  করমুক্ত আয় বাড়লেও বাড়ছে করের হার, উদ্বেগে চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্ত

অন্যদিকে সরকার বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর একটি অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হবে। যদি এই অর্থ নতুনভাবে অর্থনীতিতে প্রবেশ করে এবং দ্রুত ঋণ হিসেবে বিতরণ হয়, তাহলে বাজারে অর্থের প্রবাহ আরও বাড়তে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে ঋণের চাহিদা, বিতরণের গতি এবং উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর।

এদিকে ব্যাংকিং খাতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমানতের প্রকৃত সুদহার। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে আমানতের সুদের হার কম থাকায় প্রকৃত সুদ ঋণাত্মক হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক মানুষ ব্যাংকে সঞ্চয় করার পরিবর্তে নগদ অর্থ বা বিকল্প বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন। এতে ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধিও চাপের মুখে পড়ছে।

আরও পড়ুন  দুবছর কঠিন সময় যাবে, সবাইকে কষ্ট করতে হবে : অর্থমন্ত্রী

একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়ায় এক ধরনের ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট তৈরি হয়েছে। ফলে সুদহার কমলেও বেসরকারি খাতে প্রত্যাশিত হারে ঋণপ্রবাহ বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

সব মিলিয়ে, নীতি সুদহার কমল বলে মূল্যস্ফীতি অবশ্যই বেড়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না। তবে যদি বাজারে অর্থের সরবরাহ দ্রুত বাড়ে, খাদ্য সরবরাহে সংকট অব্যাহত থাকে এবং উৎপাদন সেই হারে না বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নত হলে সুদহার কমানোর ইতিবাচক প্রভাবও দেখা যেতে পারে।