গণতন্ত্রের ভেতর থেকেই কীভাবে স্বৈরাচারী শাসনের উত্থান ঘটে, তা ব্যাখ্যা করেছেন পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী ইতিহাসবিদ অ্যান অ্যাপলবাম। তাঁর মতে, আধুনিক সময়ে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার জন্য সব সময় সামরিক অভ্যুত্থান বা সরাসরি ক্ষমতা দখলের প্রয়োজন হয় না। বরং গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই স্বৈরাচারী শাসনের পথ তৈরি হয়।
গণতন্ত্রের এই পরিবর্তন নিয়ে সম্প্রতি এক আলোচনায় নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেন অ্যান অ্যাপলবাম।
তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক শাসক বৈধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন। এরপর এমনভাবে রাষ্ট্রের নিয়মকানুন ও প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবর্তন করতে থাকেন, যাতে ভবিষ্যতে নির্বাচনে তাদের পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। এভাবে বাইরে থেকে গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় থাকলেও ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়ে গণতন্ত্রের ভিত্তি।
অ্যাপলবামের মতে, গণতন্ত্রের পতন সব সময় আকস্মিকভাবে ঘটে না। অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি দীর্ঘ ও নীরব প্রক্রিয়া। শুরুতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা সীমিত করা হয়। এরপর বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওপর ক্ষমতাসীনদের প্রভাব বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে এসব প্রতিষ্ঠান আর স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায় না।
আধুনিক স্বৈরাচারী প্রচারণার ধরনও আগের তুলনায় অনেক বদলে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় প্রচারণায় কৃষি উৎপাদন, অর্থনৈতিক সাফল্য কিংবা ট্রাক্টর চালানো নারীদের ছবি তুলে ধরে রাষ্ট্রের উন্নয়ন দেখানো হতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক স্বৈরাচারী প্রচারণার মূল লক্ষ্য মানুষের মধ্যে হতাশা ও অসহায়ত্ব তৈরি করা। মানুষকে বোঝানো হয়, কোনো কিছু পরিবর্তন করার ক্ষমতা তাদের নেই।
এ ধরনের প্রচারণায় একই মিথ্যা বারবার ছড়ানো হয়। পাশাপাশি পরস্পরবিরোধী তথ্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়। একপর্যায়ে মানুষ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে হিমশিম খায়। তখন অনেকেই মনে করতে শুরু করেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করে কোনো লাভ নেই। বরং সবকিছু থেকে দূরে থাকাই ভালো। অ্যাপলবামের মতে, মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে রাখাই আধুনিক স্বৈরাচারী অপপ্রচারের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ক্লেপ্টোক্রেসি বা লুটেরা শাসনব্যবস্থা। এ ধরনের ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীনেরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর চেষ্টা করেন। এ জন্য নিয়মকানুন ভঙ্গ করা, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সীমিত করা, বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং আইনের শাসন দুর্বল করার মতো প্রবণতা দেখা যায়।
অ্যাপলবামের বিশ্লেষণে, স্বৈরাচারী শাসনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের সম্পর্ক গভীর। গণতন্ত্র দুর্বল হওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে নতুন ক্ষমতাসীনেরা দ্রুত বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ানোর এই প্রবণতাও গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
তাঁর মতে, বিশ্বজুড়েই এ ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গণতন্ত্রের সংকট শুধু নির্বাচন আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি, মুক্ত সাংবাদিকতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যান অ্যাপলবামের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গণতন্ত্র রক্ষায় শুধু নির্বাচনী ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখলেই চলবে না। ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের ভেতর থেকেই যখন স্বৈরাচারের উত্থান শুরু হয়, তখন সময়মতো সেই পরিবর্তন শনাক্ত করতে না পারলে পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন