বারবার ডায়েট চার্ট বদলানো, কঠোর খাবারের তালিকা মেনে চলা এবং ডায়েট বন্ধ করলেই ওজন ফিরে আসার অভিজ্ঞতায় ক্লান্ত অনেকেই। এমন পরিস্থিতিতে আলোচনায় আসছে ‘ইনটিউটিভ ইটিং’ বা সহজাত খাদ্যাভ্যাস। শরীরের স্বাভাবিক ক্ষুধা ও তৃপ্তির সংকেত বুঝে খাওয়ার এই পদ্ধতিতে খাবারকে ভালো বা খারাপ হিসেবে ভাগ করার বদলে শরীরের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ইনটিউটিভ ইটিং কোনো নির্দিষ্ট ডায়েট চার্ট নয়। কখন, কী এবং কতটুকু খাবেন তা নির্ধারণে শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়াই এর মূল কথা। এখানে কোনো নির্দিষ্ট খাবার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার নিয়ম নেই। বরং খাবারের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়।
এই পদ্ধতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডায়েটের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা। সাময়িক ও কঠোর ডায়েট পরিকল্পনা মেনে চলতে না পারলে নিজেকে অসফল ভাবার প্রবণতা কমানো এর লক্ষ্য। দীর্ঘমেয়াদে খাবার নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার বদলে সচেতনভাবে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ইনটিউটিভ ইটিংয়ের আরেকটি ভিত্তি হলো ক্ষুধাকে সম্মান করা। শরীর যখন খাবারের প্রয়োজনের সংকেত দেয়, তখন তা উপেক্ষা না করে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় ক্ষুধা চেপে রাখলে পরে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে, তাই শরীরের সংকেত বোঝা জরুরি।
পছন্দের খাবারকেও একেবারে নিষিদ্ধ না করার কথা বলা হয় এই পদ্ধতিতে। কোনো খাবারকে ‘নিষিদ্ধ’ হিসেবে দেখলে অনেক সময় সেটির প্রতি আকর্ষণ আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই খাবার উপভোগ করার পাশাপাশি নিজের ক্ষুধা ও তৃপ্তির মাত্রা বোঝার চেষ্টা করাই ইনটিউটিভ ইটিংয়ের অংশ।
খাওয়ার সময় তৃপ্তির অনুভূতিও খেয়াল করতে বলা হয়। খাবারের মাঝখানে কিছুটা বিরতি নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে আরও খাবার প্রয়োজন, নাকি ইতিমধ্যে আরামদায়কভাবে পেট ভরে গেছে? এভাবে ধীরে খাওয়া এবং শরীরের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা নিজের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে পারে।
তবে আবেগ সামলানোর একমাত্র উপায় হিসেবে খাবারের ওপর নির্ভর না করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দুশ্চিন্তা, রাগ, একাকিত্ব বা মন খারাপের সময় অনেকেই খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে খাবারের পাশাপাশি আবেগের মূল কারণ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য উপায়ে তা সামলানোর চেষ্টা করা দরকার।
নিজের শরীরকে সম্মান করাও এই পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি। সবার শারীরিক বৈশিষ্ট্য, চাহিদা ও খাওয়ার অভ্যাসএক নয়। তাই অন্য কারও শরীর বা ওজনের সঙ্গে নিজেকে তুলনা না করে নিজের স্বাভাবিক শারীরিক গঠনকে গ্রহণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শরীরচর্চার ক্ষেত্রেও একই বিষয় অনুসরণ করা হয়। শুধু ক্যালরি কমানো বা দ্রুত ওজন কমানোর জন্য ব্যায়াম না করে শরীরকে সক্রিয় ও সতেজ রাখার আনন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, পছন্দ ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ইনটিউটিভ ইটিং অনুসরণকারীদের ক্ষেত্রে খাবার নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও অপরাধবোধ কমার মতো ভালো পরিবর্তনের কথা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে এটিকে দ্রুত ওজন কমানোর কোনো কৌশল হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং খাবার ও শরীরের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি, ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির একটি পদ্ধতি হিসেবে এটি বিবেচনা করা হয়।
যাঁরা বারবার ডায়েট করে ক্লান্ত বা খাওয়ার পর অপরাধবোধে ভোগেন, তাঁদের জন্য এই পদ্ধতি উপকারী হতে পারে। তবে গুরুতর ইটিং ডিজঅর্ডার, এডিএইচডি বা অটিজমের মতো নিউরোডাইভারজেন্স কিংবা অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা থাকলে নিজে থেকে পদ্ধতিটি শুরু না করে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অর্থ প্রতিদিন নিখুঁতভাবে কোনো ডায়েট মেনে চলা নয়। বরং নিজের শরীরের প্রয়োজন বোঝা, ক্ষুধা ও তৃপ্তির সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং খাবারের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি করাই হতে পারে আরও দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস।




























