জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে রাজধানীতে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তিনি স্মৃতিস্তম্ভটির উদ্বোধন করেন। একই দিনে আধুনিকায়ন করা ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানেরও উদ্বোধন করেন সরকারপ্রধান।
সকালে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধন শেষে স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন তিনি। পরে ওসমানী উদ্যানের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং সেখানে স্থাপিত গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে নির্মাণ করা হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ। প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত স্থাপনাটির গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে খোদাই করা হয়েছে ৮৩৪ জন শহীদের নাম। স্মৃতিস্তম্ভের সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।
স্থাপনাটির বাইরের দিকে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৪ ফুট উঁচু এবং ভেতরের দিকে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৭ ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে।
এসব ভাস্কর্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্মৃতিস্তম্ভটি দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরতে ভূমিকা রাখবে।
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের পাশাপাশি রাজধানীর ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রকল্পেরও উদ্বোধন করা হয়েছে। পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত প্রায় ২৩ একর আয়তনের এই উদ্যানকে সবুজ, নিরাপদ ও আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি নতুন করে পাঁচটি জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে, যাতে নগরবাসী আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাতে পারেন।
উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিংয়ের জায়গা এবং জলাশয়ের ঘাট তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
উদ্যানটির নকশায় চলাচলের সুবিধার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুই স্তরে সাজানো এ উদ্যানের সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে দ্রুত চলাচলের পথ নির্মাণ করা হয়েছে।
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং ওসমানী উদ্যান আধুনিকায়নের প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্য একদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ, অন্যদিকে রাজধানীর নাগরিক পরিবেশের উন্নয়ন।
একটি স্থাপনা দেশের ইতিহাস ও আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে আধুনিকায়ন করা উদ্যান নগরবাসীর হাঁটাচলা, ব্যায়াম ও অবসর কাটানোর সুযোগ বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শহীদ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন অনুষ্ঠানটির বিশেষ তাৎপর্য তৈরি করেছে। স্মৃতিস্তম্ভে খোদাই করা নাম ও আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো তুলে ধরার স্মারক হয়ে থাকবে।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন