মেটার ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা প্রযুক্তি দুনিয়ায় বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি করেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মালিক প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড এবং ব্যবহারকারীর তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি বিরোধের পর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর এক বিচারক এই বিশাল অঙ্কের জরিমানা করেছেন। বুধবার দেওয়া এই রায় মেটার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জরিমানা হিসেবে সামনে এসেছে।

দুই সপ্তাহের বিচার শেষে আদালত মনে করেছে, ফেসবুকের ব্যবহারকারীর তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত ও শেয়ার করা হতো, সে বিষয়ে মেটা বছরের পর বছর জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করেছে। বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটির আইন লঙ্ঘন ও জনগণকে ভুল তথ্য দেওয়ার ঘটনা ইচ্ছাকৃত ছিল এবং তা ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছে।

আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, মেটার শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগের কিছু অংশ এমনভাবে পরিচালিত হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করা। ব্যবহারকারীর তথ্য তাদের অনুমতি ছাড়া তৃতীয় পক্ষের কাছে দেওয়া বা ব্যবহারের সুযোগ নেই বলে মেটার নির্বাহীরা বছরের পর বছর যে বক্তব্য দিয়ে এসেছিলেন, নিউ মেক্সিকোর আইনজীবীরা সেটিকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।

এই মামলার সূত্রপাত ফেসবুকের তথ্য ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত বহুল আলোচিত ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি থেকে। প্রতিষ্ঠানটি কয়েক মিলিয়ন ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য রাজনৈতিক পরামর্শকাজে ব্যবহার করেছিল। এর মধ্যে ২০১৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজও ছিল।

নিউ মেক্সিকো আরও অভিযোগ করেছিল, ঘৃণাত্মক বক্তব্য থাকা কনটেন্ট থেকে মেটা কীভাবে লাভবান হতো এবং এ ধরনের কনটেন্টের বিরুদ্ধে কোম্পানির নীতিমালা কীভাবে প্রয়োগ করা হতো, সে বিষয়েও প্রতিষ্ঠানটি ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে। বিচারকাজে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রেও মেটার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত আসে।

নিউ মেক্সিকোর আইনজীবীদের দাবি ছিল, রাজ্যের প্রায় ২০ লাখ মানুষ মেটার তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসততার প্রভাবে পড়েছেন। একটি জুরি দেখতে পেয়েছে, মেটা রাজ্যের আইন ৪ কোটিরও বেশি বার লঙ্ঘন করেছে। রাজ্যের পক্ষ থেকে মেটার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৪০ বিলিয়ন ডলার জরিমানার দাবি জানানো হয়েছিল। অন্যদিকে মেটা যুক্তি দিয়েছিল, ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি জরিমানা অসাংবিধানিক হবে।

তবে বিচারক শেষ পর্যন্ত ২৫ বিলিয়ন ডলারের জরিমানা নির্ধারণ করেন। আদালতের হিসাবে, বিভিন্ন আইন লঙ্ঘনের জন্য জরিমানার পূর্ণ অঙ্ক ২১৯ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকে তা কমিয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলারে নির্ধারণ করা হয়। বিচারক এই অঙ্ককে মেটার প্রায় এক চতুর্থাংশের মুনাফার সমান বলে উল্লেখ করেছেন।

মেটা অবশ্য আদালতের অভিযোগ ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নয়। কোম্পানিটির প্রধান আইনজীবী সিজে মাহোনি বলেছেন, এই রায়ের কারণে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে ব্যবসা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। তিনি জানিয়েছেন, মেটা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে এবং সেই আপিলে সফল হওয়ার বিষয়ে তারা আশাবাদী।

নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল টোরেজ বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের আকার ও প্রভাবের কারণে নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে এসেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই রায় দেখিয়েছে কোনো প্রতিষ্ঠানই আইনের জবাবদিহির বাইরে নয়।

মেটার জন্য চলতি বছরটি এরই মধ্যে একাধিক আইনি জরিমানার কারণে কঠিন হয়ে উঠেছে। নিউ মেক্সিকোতেই শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের আরেকটি জরিমানা করা হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন ২০১৯ সালে তথ্য গোপনীয়তা সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের জন্য মেটাকে ৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছিল।

এদিকে আইনি জরিমানার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতেও বিপুল অর্থ ব্যয় করছে মেটা। প্রতিষ্ঠানটি এ বছর মূলত এআই প্রকল্পে অন্তত ১৩৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে, যা ১৪৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ জানিয়েছেন, ভোক্তাদের জন্য তৈরি এআই টুল মিউজ ইতোমধ্যে ১ কোটি মানুষ ব্যবহার করছে।

এআই খাতে বড় বিনিয়োগের প্রভাব কোম্পানির আর্থিক অবস্থাতেও দেখা যাচ্ছে। মেটার জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ের আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেড়ে ৬৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। তবে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে কোম্পানিটি ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি নেতিবাচক নগদ প্রবাহও দেখেছে।

এই পরিস্থিতিতে মেটা একদিকে তথ্য গোপনীয়তা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে আইনি চাপ সামলাচ্ছে, অন্যদিকে এআই প্রতিযোগিতায় অবস্থান শক্ত করতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। নিউ মেক্সিকোর ২৫ বিলিয়ন ডলারের রায় তাই শুধু একটি জরিমানার ঘটনা নয়, বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক নীতি ও ব্যবহারকারীর তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলমান বিতর্ককেও নতুন করে সামনে এনেছে।