পঞ্চগড়ে হেমন্ত যেন প্রকৃতির নিজস্ব রূপে ধরা দিচ্ছে। দিনে গরম, সন্ধ্যার পর ঠান্ডা আর ভোরে কুয়াশা ও শিশির সব মিলিয়ে উত্তরের এই জেলায় অনুভূত হচ্ছে ঋতু পরিবর্তনের স্পষ্ট ছোঁয়া। পাশাপাশি গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্র শুরু হয়েছে চিতই ও ভাপা পিঠার আয়োজন। সামনে নবান্ন, তাই প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জীবনেও ছড়িয়ে পড়ছে উৎসবের আমেজ।
ভোরের আলো যখন কুয়াশার পর্দা ভেদ করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু ঝলমল করে ওঠে। পঞ্চগড়ের গ্রামাঞ্চলে এখন এমন দৃশ্য চোখে পড়ছে নিয়মিত। দিনের উষ্ণতা আর রাতের ঠান্ডার বৈপরীত্যের মধ্যেই ধীরে ধীরে জানান দিচ্ছে শীতের আগমন।
হেমন্তের এই সময়ে পঞ্চগড়ে দিনের আবহাওয়া তুলনামূলক উষ্ণ থাকলেও সন্ধ্যার পর তাপমাত্রা কমতে শুরু করে। কোনো কোনো দিন শেষ রাতে দেখা দেয় কুয়াশা, যা সকাল ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৯ থেকে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩১ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে দিনের গরম আর রাতের ঠান্ডা মিলিয়ে আবহাওয়ায় তৈরি হচ্ছে ভিন্ন ধরনের অনুভূতি।
পঞ্চগড় আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়া পর্যবেক্ষক রোকনুজ্জামান জানান, হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থানের কারণে এ অঞ্চলে প্রতিবছরই তাপমাত্রার তারতম্য দেখা যায়। দিনে গরম ও রাতে ঠান্ডার কারণে এ সময় আবহাওয়ায় এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়।
পঞ্চগড়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এখানে হেমন্তের রূপ তুলনামূলক স্পষ্ট। ভোরের শিশির ও কুয়াশা যেমন প্রকৃতিকে নতুন সৌন্দর্য দেয়, তেমনি রাতের ঠান্ডা শীতের আগমনের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
জেলা প্রশাসক মোছা. শুকরিয়া পারভীন বলেন, পঞ্চগড়ের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানে হেমন্তের বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। ইতোমধ্যে হালকা শীতও পড়তে শুরু করেছে। দেশের সর্বউত্তরের জেলা হওয়ায় এখানে শীতের প্রভাব বেশি থাকে। তাই আগেভাগেই প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন।
তিনি আরও জানান, শীত তীব্র হলে নিম্ন আয়ের মানুষের যেন কষ্ট না হয়, সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে।
শীতের সময় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য উষ্ণ পোশাক ও প্রয়োজনীয় সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাপমাত্রা আরও কমে গেলে এসব মানুষের দুর্ভোগ কমাতে প্রস্তুতি ও সহায়তা কার্যক্রম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চগড়ের গ্রাম ও শহরে শুরু হয়েছে পিঠাপুলির আয়োজন। রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকানে বিক্রি হচ্ছে চিতই ও ভাপা পিঠা। সন্ধ্যার পর এসব দোকানে মানুষের আনাগোনা বাড়ছে। শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে পিঠার উষ্ণতা যেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাড়তি আনন্দ যোগ করছে।
পঞ্চগড় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্য শফিকুল আলম বলেন, এখন রাস্তা দিয়ে হাঁটলেই চিতই ও ভাপা পিঠা বিক্রি করতে দেখা যায়। গ্রাম কিংবা শহর- সবখানেই এই ঐতিহ্য ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ যত আধুনিক জীবনেই অভ্যস্ত হোক, নিজের শেকড় ও সংস্কৃতিকে ভুলে থাকতে পারে না।
কৃষিনির্ভর বাংলার জীবনে হেমন্তের সঙ্গে নবান্নের সম্পর্ক বহু পুরোনো। নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দ, পরিবারের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি এবং নানা লোকজ আয়োজন এ উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শফিকুল আলমের মতে, একসময় আশ্বিন ও কার্তিক মাসে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় অভাব-অনটনের কঠিন পরিস্থিতি দেখা দিত। কৃষিভিত্তিক নানা উদ্যোগ ও মানুষের পরিশ্রমের ফলে সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। এতে অগ্রহায়ণে ধান পাকার সময় ঘিরে নবান্নের আনন্দ আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি মনে করেন, পঞ্চগড়ের ঋতুভিত্তিক সৌন্দর্য, লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনকে লেখালেখি, ছবি আঁকা এবং আলোকচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা দরকার। এতে এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচিতি বাড়ার পাশাপাশি পর্যটনের সম্ভাবনাও বিকশিত হতে পারে।
পঞ্চগড়ের ভোরের কুয়াশা, শিশিরভেজা মাঠ, হিমেল রাত ও পিঠাপুলির আয়োজন পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ঐতিহ্য তুলে ধরার সুযোগও রয়েছে।
আশ্বিন-কার্তিকের এই সময়ে ভোররাত থেকেই ঠান্ডা অনুভূত হয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কমে, সকালে কুয়াশা দেখা দেয়। তবে দিনের আবহাওয়া এখনো তুলনামূলক উষ্ণ থাকায় শীতের অনুভূতি সব সময় এক রকম নয়।
প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সঙ্গে পঞ্চগড়ের মানুষের জীবনেও আসছে নতুন ছন্দ। কোথাও চলছে শীতের প্রস্তুতি, কোথাও পিঠা তৈরির আয়োজন, আবার কৃষকের চোখে নতুন ফসল ঘরে তোলার প্রত্যাশা।
দিনের গরম, রাতের হিমেল বাতাস, ভোরের কুয়াশা আর ঘাসে জমে থাকা শিশির- সব মিলিয়ে পঞ্চগড়ে হেমন্তের রূপ এখন স্পষ্ট। সামনে শীত, আর তার আগেই নবান্নের আনন্দে উত্তরের এই জনপদে তৈরি হয়েছে এক স্বতন্ত্র ঋতুময় আবহ।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন