নেতানিয়াহুর নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন ইসরায়েলে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দেশটিতে জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলছে। স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় শুরু হওয়া ভোটগ্রহণ রাত ১০টা পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করতে পারে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন, নাকি দেশটির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হবে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে রয়েছেন নেতানিয়াহু।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই হামলা, গাজায় দীর্ঘ সামরিক অভিযান, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থান সবকিছুই এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নেতানিয়াহুর সমর্থকদের কাছে তিনি নিরাপত্তা ও সামরিক নেতৃত্বের প্রতীক। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, ২০২৩ সালের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন না প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের মতে, দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে ভোটারদের সামনে জবাবদিহি প্রয়োজন।

নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। তবে যুদ্ধ পরিচালনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং তাঁর সরকারের নীতি নিয়ে দেশটির জনগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ভোটের ফল সেই বিভক্তিরই প্রতিফলন হতে পারে।

এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। নিরাপত্তা ও সামরিক বিষয়ে অভিজ্ঞ এই রাজনীতিক মধ্যপন্থী এবং ডানপন্থী দুই ধরনের ভোটারের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

আইজেনকট নেতানিয়াহুর প্রচারণার সমালোচনা করে বলেছেন, ভয় ও হুমকিকে সামনে রেখে ভোটারদের প্রভাবিত করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনে যে পক্ষই জিতুক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখা সম্ভব।

অন্যদিকে নেতানিয়াহু তাঁর যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে প্রচারণায় গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের হুমকি মোকাবিলায় তাঁর নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পও প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের আসনসংখ্যা ১২০। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন। দেশটির আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় একক দল নয়, বরং বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে জোট সরকার গঠনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং তার ডানপন্থী মিত্ররা পর্যাপ্ত আসন পেলে তিনি আবারও সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কট্টর ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে বিরোধী শিবিরও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা করছে। কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে জোট গঠন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ইসরায়েলি হামলায় সেখানে নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজারে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই যুদ্ধের মানবিক মূল্য, জিম্মিদের ভবিষ্যৎ এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা তাঁর সামরিক পদক্ষেপকে নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন। সমালোচকেরা বলছেন, হামলার দায় ও সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

এ ছাড়া লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান এবং ইরানের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলাও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘু ভোটারদের উপস্থিতি এবং তাঁদের ভোটের হিসাবও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পার্লামেন্টে কোনো জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে ছোট দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।

আইজেনকট আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি জোট করার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে কোনো কোনো আরব দল বিরোধী জোটকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে। এমন সমর্থন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্বাচনের ফল ও পরবর্তী আলোচনা থেকে বোঝা যাবে।

দীর্ঘদিনের দুর্নীতির মামলাও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার অংশ। তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। একই সঙ্গে তাঁর সরকারের ডানপন্থী নীতি, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচনে কোনো পক্ষই বড় ব্যবধানে জিতবে- এমন নিশ্চয়তা নেই। ভোটের ফলের পাশাপাশি ছোট দলগুলোর আসনসংখ্যা এবং জোট গঠনের সক্ষমতাও নির্ধারণ করবে কে সরকার পরিচালনা করবেন।

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন শুধু নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার প্রশ্ন নয়; এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতি, যুদ্ধের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জোটের দিকনির্দেশও নির্ধারণ করতে পারে। তবে চূড়ান্ত ফল ও সরকার গঠনের সমীকরণ পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতই থাকছে।