দেশের জ্বালানি খাতে আবারও মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা এসেছে। জুন মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের লিটারপ্রতি পাঁচ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। তবে সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর হলো, বহুল ব্যবহৃত ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। নতুন এই মূল্য আগামী ১ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে। ফলে মাসিক মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থার আওতায় সরকার নতুন করে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করেছে। এতে পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে অকটেনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪৫ টাকা, পেট্রলের দাম ১৪০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা। এর ফলে গত মাসের তুলনায় অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি পাঁচ টাকা করে বেড়েছে। এর আগে এপ্রিল মাসে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে মে মাসজুড়ে এই মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়। কিন্তু জুন মাসের শুরুতেই আবারও মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি শুধু ভোক্তা পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস তেলের মূল্যও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নতুন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে, ফার্নেস তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ১৯ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সোমবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে এই নতুন দর কার্যকর হয়েছে। এর আগে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়েও ফার্নেস তেলের দাম লিটারপ্রতি ২৪ টাকা ৫৯ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। ফলে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ফার্নেস তেলের মূল্য প্রায় ৬১ শতাংশ বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ওপর এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বিইআরসির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ১৩ এপ্রিল থেকে ১২ মে পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকাশিত ফার্নেস তেলের গড় মূল্য এবং মে মাসে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের রপ্তানি মূল্য বিবেচনায় এনে এই সমন্বয় করা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সরবরাহকৃত ফার্নেস তেলের নতুন মূল্যহার সেই হিসাবের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট ১৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৫৬টি ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৫ হাজার ৫৪১ মেগাওয়াট। সরকারি খাতে ১৫টি এবং বেসরকারি খাতে ৪১টি কেন্দ্র ফার্নেস তেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
জানা গেছে, কিছু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদেশ থেকে ফার্নেস তেল আমদানি করে থাকে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সরবরাহের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি তাদের উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব ফেলবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচও বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতেও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে নিয়মিত মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ওঠানামার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারেও সেই প্রভাব প্রতিফলিত হচ্ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষায় এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে জুন মাসের শুরুতেই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি দেশের সাধারণ মানুষ, পরিবহন খাত এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের মূল্য বৃদ্ধি দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এখন পরিস্থিতি কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতির ওপর।





























