জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার এক মাস পার হলেও দেশে হামের সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমলেও প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি মানুষ হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে। এ পরিস্থিতি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গত ২০ মে জাতীয় হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইন শেষ হয়। সরকার আশা করেছিল, কর্মসূচি শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা গ্রহণের দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার কথা। সে হিসেবে এখন সংক্রমণ আরও কমে আসার কথা ছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ঢাকা কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণেও মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। ১ থেকে ৭ জুন পর্যন্ত এক সপ্তাহে আগের সপ্তাহের তুলনায় কিছু সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও নতুন রোগী শনাক্তের সংখ্যা পুরোপুরি কমেনি।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা এবং নিশ্চিত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা সামান্য বেড়েছে। যদিও একই সময়ে মৃত্যু ও গুরুতর উপসর্গের হার কিছুটা কমেছে। ফলে পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্বাভাবিক বলা যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, জুন মাসে আক্রান্তের সংখ্যা মে মাসের তুলনায় কমেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জুনের শেষ নাগাদ সংক্রমণ আরও কমে আসবে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, শুধু আক্রান্তের সংখ্যা কমার প্রবণতা থাকলেই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলা যাবে না। তাদের মতে, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে হবে এবং মৃত্যু প্রায় শূন্যের কোঠায় নামতে হবে।
সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এক দিনে সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ১ হাজার ৭৮ জন। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৯৬ জনের।
এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে তিন হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসাধীন ছিল। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে রোগটি এখনো জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু টিকা পায়নি, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
মার্চ মাসের শুরুতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ার পর সরকার জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে লাখ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হয়। সরকারের দাবি, লক্ষ্যমাত্রার বড় অংশের শিশু টিকা পেয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে টিকার আওতার বাইরে থাকা কিছু শিশুর কারণে সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে সময় লাগছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকা দিলেই হবে না, টিকার কার্যকারিতা, রোগীর অবস্থান এবং সংক্রমণের বিস্তার সম্পর্কেও নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এ ছাড়া দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।
অনেক বিশেষজ্ঞ অভিযোগ করেছেন, মাঠপর্যায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। ফলে কোথায় সংক্রমণ বেশি এবং কেন রোগীর সংখ্যা কমছে না, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।
তথ্যের ঘাটতির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগী শনাক্ত, টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের সংখ্যা এবং সংক্রমণ প্রবণতা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতি মূল্যায়ন সহজ হবে।
অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিশু হাসপাতালে আসায় তারা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সচেতনতার ঘাটতি সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, কাশি বা চোখ লাল হয়ে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। হামের উপসর্গ অবহেলা করলে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু টিকাদান নয়, পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে কার্যকর হলে সংক্রমণ কমানো সম্ভব।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা আরও কমবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কারণ প্রতিদিন হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে আসা এখনো একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা।
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, চিকিৎসক, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। তবেই জাতীয় টিকা ক্যাম্পেইনের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে।





























