পশ্চিমবঙ্গে উৎসবহীন ঈদুল আজহা এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভেঙে কলকাতার রেড রোডে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত না হওয়ায় রাজ্যজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে হতাশার আবহ দেখা গেছে। পরিবর্তে ব্রিগেড ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে মানুষের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ধর্মীয় উৎসবের যে প্রাণবন্ত পরিবেশ সাধারণত ঈদুল আজহার দিনে দেখা যায়, এবার তার অনেকটাই অনুপস্থিত ছিল।
সকাল সাড়ে আটটায় ব্রিগেড ময়দানে ঈদের জামাত শুরু হয়। জামাতে ইমামতি করেন ইমামে ঈদাইন কারী ফজলুর রহমান। তবে কয়েক বছর আগেও যেখানে লাখো মুসল্লির উপস্থিতি দেখা যেত, সেখানে এবার উপস্থিতির সংখ্যা ছিল অনেক কম। মাঠজুড়ে মানুষের ভিড়ের পরিবর্তে দেখা গেছে ফাঁকা জায়গা। অনেকের চোখে-মুখে ছিল হতাশা ও অনিশ্চয়তার ছাপ। রেড রোডের ঈদের জামাত কলকাতার একটি সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। ব্রিটিশ আমলে খিলাফত কমিটির উদ্যোগে এখানে ঈদের নামাজ শুরু হয়েছিল। সে সময় বর্তমানের মতো উন্নত সড়ক ব্যবস্থা ছিল না। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী রেড রোড নির্মাণ করলেও ঈদের জামাতের ঐতিহ্য বজায় ছিল। স্বাধীনতার পরও সেই ধারাবাহিকতা দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত ছিল।
স্থান পরিবর্তনের কারণে শুধু জামাতের পরিবেশই বদলায়নি, অনেকের মতে উৎসবের আবেগও কমে গেছে। ঈদুল আজহা সাধারণত মুসলিম সমাজে মিলন, আনন্দ ও আত্মত্যাগের বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু এবার পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় সেই উৎসবমুখর আবহ খুব একটা চোখে পড়েনি। অনেক এলাকায় কোরবানির সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ধর্মীয় ও সামাজিক মহলের একাংশ মনে করছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সামাজিক বাস্তবতার কারণে মুসলিম সমাজের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। তারই প্রতিফলন দেখা গেছে এবারের ঈদ উদযাপনে। যদিও এ বিষয়ে সরকারি কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, তবুও সাধারণ মানুষের আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
রেড রোডের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কলকাতার মুসলিম সমাজের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এই ইতিহাস শুধু একটি নামাজের স্থান নয়, বরং একটি সম্প্রদায়ের স্মৃতি ও পরিচয়ের অংশ। সেই কারণেই স্থান পরিবর্তনের বিষয়টি অনেকের কাছে আবেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা গেছে। ঐতিহাসিকভাবে কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকার সঙ্গে ওয়াকফ সম্পত্তির সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। নবাব আলীবর্দী খাঁর সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী যুগে বহু জমি ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজে দান করা হয়েছিল। এসব সম্পত্তির একটি বড় অংশ বর্তমানে বিভিন্ন জটিলতা ও দখল সমস্যার মুখোমুখি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াকফ সম্পত্তির যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বহু বছর আগে প্রকাশিত সাচার কমিটির প্রতিবেদনে মুসলিম সমাজের উন্নয়নে ওয়াকফ সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের অনেকেই মনে করেন, ওয়াকফ সম্পত্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প গড়ে তোলা সম্ভব হতো। এতে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের উপকার হতো এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসত।
তবে ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য। কলকাতা ও বাংলার অতীত ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহযোগিতার বহু উদাহরণ রয়েছে। মসজিদ, মন্দির এবং অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনার উন্নয়নে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সহযোগিতার নজির ইতিহাসে সংরক্ষিত আছে। এসব ঘটনা বাংলার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমান সময়ে যখন বিভাজন ও রাজনৈতিক বিতর্ক বেশি আলোচিত হয়, তখন সেই সম্প্রীতির ইতিহাস অনেকটাই আড়ালে পড়ে যায়। অথচ সামাজিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতে অতীতের ইতিবাচক উদাহরণগুলো স্মরণ করা প্রয়োজন। ইতিহাসের সেই শিক্ষা ভবিষ্যতের পথচলায়ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে উৎসবহীন ঈদুল আজহা শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজনের পরিবর্তিত চিত্র নয়, বরং এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নানা প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। রেড রোডের ঐতিহ্য থেকে ব্রিগেড ময়দানের বাস্তবতা পর্যন্ত পুরো ঘটনাপ্রবাহ রাজ্যের মুসলিম সমাজের অনুভূতি, প্রত্যাশা এবং উদ্বেগের প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। ঈদের আনন্দের দিনে সেই বিষণ্নতার ছাপই এবার সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে।





























