বিশ্বজুড়ে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব মা দিবস। প্রতি বছরের মতো এবারও মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা আয়োজনের মাধ্যমে স্মরণ করা হচ্ছে সেই মানুষটিকে, যিনি সন্তানের জীবনের প্রথম আশ্রয়, প্রথম শিক্ষক এবং সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা। ‘মা’ শব্দটি ছোট হলেও এর গভীরতা বিশাল। একজন মা সন্তানের জন্য নিজের সুখ, স্বপ্ন ও স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করতেও দ্বিধা করেন না। সন্তানের মুখের হাসির জন্য তিনি দিনের পর দিন কষ্ট সহ্য করেন, কিন্তু নিজের দুঃখ প্রকাশ করেন না। তাই মা দিবস কেবল একটি উৎসব নয়, বরং মায়ের প্রতি অন্তরের ভালোবাসা জানানোর একটি বিশেষ দিন।
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ অনেকেরই কমে গেছে। কর্মব্যস্ততার কারণে অনেক সন্তান প্রতিদিন মায়ের সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সময় পান না। ফলে মা দিবস এমন একটি উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যখন সন্তানরা বিশেষভাবে মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন। বিশ্ব মা দিবসের ইতিহাস বেশ পুরোনো। আধুনিক মা দিবসের সূচনা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯০৭ সালে ফিলাডেলফিয়ার আনা জারভিস তার মা আনা রিভস জারভিসের স্মরণে একটি ছোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। তার মা সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্য ও মায়েদের সচেতনতা নিয়ে কাজ করতেন।
মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আনা জারভিস এই উদ্যোগ নেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, পরিবারের জন্য মায়েরা যে নিঃস্বার্থ ত্যাগ স্বীকার করেন, তার যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। তার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই ১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালন করা হয়। পরে ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে সরকারি মা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেন। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই দিনে বিশ্ব মা দিবস পালিত হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিবসটির জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এটি এখন বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি পারিবারিক দিবসে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশেও প্রতি বছর বিশ্ব মা দিবসের গুরুত্ব বাড়ছে। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি আয়োজন করে থাকে। কোথাও আলোচনা সভা, কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আবার কোথাও মায়েদের সম্মাননা দেওয়ার আয়োজন করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মা দিবসকে কেন্দ্র করে আবেগঘন বার্তা ও স্মৃতিচারণ দেখা যায়। অনেকেই এই দিনে মাকে ফুল, শাড়ি কিংবা ছোট উপহার দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করেন। কেউ আবার শুধু মায়ের সঙ্গে কিছু সময় কাটান। অনেকের কাছে সেটিই সবচেয়ে বড় উপহার। কারণ একজন মা সন্তানের কাছ থেকে দামি উপহারের চেয়ে আন্তরিক ভালোবাসা ও যত্নকেই বেশি মূল্য দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মা দিবস শুধু আনুষ্ঠানিক উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। মায়ের প্রতি সম্মান, যত্ন এবং দায়িত্ববোধ হওয়া উচিত প্রতিদিনের অভ্যাস। বৃদ্ধ বয়সে মায়ের পাশে দাঁড়ানো, তার শারীরিক ও মানসিক খোঁজ রাখা এবং তাকে সময় দেওয়া প্রতিটি সন্তানের দায়িত্ব।সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, আধুনিক জীবনের পরিবর্তনের কারণে পারিবারিক বন্ধনে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হলেও মা এখনো পরিবারের মূল শক্তি। সন্তানদের মানসিক বিকাশ, নৈতিক শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধ গঠনে একজন মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তাই মায়ের অবদান কখনো কোনো নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়।
বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বার্তা দিয়েছেন। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মায়ের সঙ্গে ছবি প্রকাশ করে নিজেদের অনুভূতি তুলে ধরছেন। আবার যারা মাকে হারিয়েছেন, তারা স্মৃতিচারণের মাধ্যমে মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করছেন।পৃথিবীতে অনেক সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, কিন্তু মা ও সন্তানের সম্পর্ক চিরন্তন। একজন মা সন্তানের সুখে হাসেন, দুঃখে কাঁদেন এবং সবসময় তার পাশে থাকার চেষ্টা করেন। তাই মা শুধু একটি শব্দ নয়, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক।
আজকের এই বিশ্ব মা দিবসে প্রতিটি সন্তানের উচিত মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কারণ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মায়ের অবদান অপরিসীম। ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা আর ত্যাগের যে অদৃশ্য বন্ধনে একটি পরিবার টিকে থাকে, তার কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকেন একজন মা।






















