রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরকে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালের ৫ মে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলার অগ্রগতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা বর্তমান বিএনপি-সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রসিকিউশন টিমকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন হেফাজতে ইসলামের একটি প্রতিনিধিদল। সাক্ষাৎ শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সংগঠনটির নেতারা। তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই মামলার তদন্ত এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী ৭ জুন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই মামলার কার্যক্রম নতুন গতি পেয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলছিল। নতুন চিফ প্রসিকিউটর দায়িত্ব নেওয়ার পর মামলার তদন্ত আরও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমরা আজ চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছি। তিনি আমাদের জানিয়েছেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও ডকুমেন্ট সংগ্রহের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। আগামী ৭ জুন মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।”
হেফাজত নেতারা অভিযোগ করেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর অভিযান চালিয়েছিল। তারা দাবি করেন, ওই ঘটনায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। যদিও সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছিল, তবে হেফাজতে ইসলাম শুরু থেকেই এটিকে “গণহত্যা” হিসেবে উল্লেখ করে আসছে।
আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, “সেদিন যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। শেখ হাসিনা, তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং যৌথ বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে যেন কোনো সরকার বা বাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে এমন অভিযান চালানোর সাহস না পায়, সেজন্য এই মামলার সুষ্ঠু বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের কাছে তারা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন বলেও জানান তিনি।
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ডাকা সমাবেশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘর্ষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। গভীর রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে সমাবেশ সরিয়ে দেয়। এরপর থেকেই ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় বিতর্কের জন্ম দেয়। হেফাজতে ইসলাম বরাবরই দাবি করে আসছে, ওই অভিযানে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে তৎকালীন সরকার দাবি করেছিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে সীমিত অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলার অগ্রগতি এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার পর বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার বিচারিক অগ্রগতি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত বিভিন্ন বিতর্কিত ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে জনগণের মধ্যে যে আলোচনা রয়েছে, তার মধ্যে শাপলা চত্বরের ঘটনাও অন্যতম।
এদিকে হেফাজতে ইসলামের নেতারা জানিয়েছেন, তারা আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখছেন এবং আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন। একই সঙ্গে তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব না পড়ে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়।
শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতি, মানবাধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা বিতর্ক চলমান রয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে যাওয়ায় নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ২০১৩ সালের সেই বহুল আলোচিত রাত।






















