বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার নতুন মাত্রা যোগ করতে সিলেটে শুরু হয়েছে টাইগার লাইটনিং-২০২৬ নামে ১৩ দিনব্যাপী যৌথ সামরিক মহড়া। রবিবার (১৯ জুলাই) সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডে আনুষ্ঠানিকভাবে এ মহড়ার উদ্বোধন করা হয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস আর্মি প্যাসিফিক (USARPAC)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মহড়া আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত চলবে। সামরিক দক্ষতা বৃদ্ধি, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, মানবিক সহায়তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সমন্বয় আরও শক্তিশালী করাই এর মূল লক্ষ্য।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে অংশ নেন চিফ অব জেনারেল স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাইনুর রহমান।
এছাড়াও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের প্রতিনিধিদল, ইউএস আর্মি প্যাসিফিকের সামরিক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, টাইগার লাইটনিং শুধু একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নিরাপদ ও স্থিতিশীল ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতি যৌথ অঙ্গীকারের প্রতীক।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের যৌথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আন্তঃকার্যক্ষমতা (Interoperability) আরও বৃদ্ধি পাবে। ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় উভয় দেশ আরও কার্যকরভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারবে।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাইনুর রহমান বলেন, টাইগার লাইটনিং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সামরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তার ভাষায়, যৌথ অনুশীলনের মাধ্যমে—
- সেনাসদস্যদের আভিযানিক দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
- আধুনিক যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন হবে।
- পারস্পরিক সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে।
- দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব সুদৃঢ় হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়মিত যৌথ প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের মহড়ায় মোট ১৮৪ জন সেনাসদস্য অংশগ্রহণ করছেন।
এর মধ্যে—
- যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস আর্মি প্যাসিফিক (USARPAC) এবং ওরেগন ন্যাশনাল গার্ড থেকে ৯১ জন।
- বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড ও অন্যান্য ইউনিট থেকে ৯৩ জন সদস্য অংশ নিচ্ছেন।
অংশগ্রহণকারী সদস্যদের মধ্যে বিশেষ বাহিনীর প্রশিক্ষক, পরিকল্পনাবিদ এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিটের সদস্য রয়েছেন।
যদিও পুরো প্রশিক্ষণ সূচি প্রকাশ করা হয়নি, তবে সামরিক সূত্রে জানা যায়, মহড়ায় আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন বিষয়ে অনুশীলন হবে।
সম্ভাব্য প্রশিক্ষণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—
- বিশেষ অভিযান (Special Operations)
- সন্ত্রাসবাদ দমন কৌশল
- জিম্মি উদ্ধার অভিযান
- নগর এলাকায় অভিযান (Urban Operations)
- আকাশ ও স্থল সমন্বিত অভিযান
- দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রম
- মানবিক সহায়তা প্রদান
- মেডিক্যাল ইভাকুয়েশন
- যৌথ পরিকল্পনা ও কমান্ড ব্যবস্থাপনা
- যোগাযোগ ও তথ্য সমন্বয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গত কয়েক বছরে আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বিশেষ করে—
- ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা
- সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ
- সামুদ্রিক নিরাপত্তা
- শান্তিরক্ষা কার্যক্রম
- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
- মানবিক সহায়তা
এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
টাইগার লাইটনিং-২০২৬ সেই সহযোগিতারই একটি বাস্তব উদাহরণ।
বর্তমানে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বৈশ্বিক কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এই অঞ্চলে নিরাপত্তা, সমুদ্রপথের স্বাধীনতা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দেশটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে আসছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ
- দুর্যোগ মোকাবিলা মহড়া
- শান্তিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়ন
- সামরিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিনিময়
- সন্ত্রাসবাদ দমন সহযোগিতা
- মানবিক সহায়তা কার্যক্রম
বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম শীর্ষ সেনা প্রেরণকারী দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেশটির সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, টাইগার লাইটনিং-২০২৬ সফলভাবে সম্পন্ন হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরও উন্নত যৌথ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এ ধরনের মহড়া শুধু সেনাবাহিনীর পেশাগত দক্ষতাই বাড়ায় না, বরং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও কৌশলগত সম্পর্ককেও আরও শক্তিশালী করে।
আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত চলমান এই মহড়ায় বিভিন্ন ধাপে মাঠ পর্যায়ের অনুশীলন, পরিকল্পনা মহড়া, বিশেষ অভিযান এবং সমাপনী প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।




























