দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা অখালাসকৃত কনটেইনারের জট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। কাস্টমসের জটিলতা, আইনি প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং সময়মতো পণ্য খালাস না হওয়ায় হাজার হাজার কনটেইনার বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। এতে বন্দরের কার্যক্ষমতা ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের ওপর চাপ বাড়ছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্র অনুযায়ী, বহু কনটেইনার বছরের পর বছর নিলামের অপেক্ষায় রয়েছে। কিছু কনটেইনারে থাকা পণ্য নষ্ট হয়ে গেলেও প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণে সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে বন্দরের মূল্যবান ইয়ার্ড দীর্ঘদিন ধরে দখল হয়ে থাকছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্দরের বিভিন্ন শেডে নিলামের অপেক্ষায় রয়েছে—
- ২০ ফুটের কনটেইনার: ২,৭৪৮টি
- ৪০ ফুটের কনটেইনার: ৬,৬১৮টি
এসব কনটেইনারে থাকা অনেক পণ্যের গুণগত মান ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কনটেইনার জট কমাতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস চলতি জুলাই মাসে ১৬৮টি কনটেইনার অনলাইন (ই-অকশন) নিলামে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা অখালাসকৃত পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তি করে বন্দরের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন কনটেইনার আটকে থাকায়—
- বন্দরের সংরক্ষণ ব্যয় বাড়ছে।
- নতুন আমদানি পণ্যের জন্য জায়গার সংকট তৈরি হচ্ছে।
- শিপিং লাইন ও আমদানিকারকদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে।
- দেশের আমদানি-রপ্তানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বন্দর ও কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, কিছু কনটেইনার ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে বন্দরে পড়ে আছে। এসব কনটেইনারের অনেকগুলোর মালিক আর পণ্য খালাস করতে আসেননি। আবার অনেক ক্ষেত্রে আমদানিকারকের সঙ্গে আইনি বিরোধ, শুল্ক জটিলতা কিংবা ভুল ঘোষণার কারণে পণ্য আটকে আছে। ফলে বছরের পর বছর মূল্যবান জায়গা দখল করে রেখেছে এসব কনটেইনার।
নিলামের অপেক্ষায় থাকা কনটেইনারগুলোতে রয়েছে—
- শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি
- ক্যাপিটাল মেশিনারি
- এলিভেটর ও লিফটের যন্ত্রাংশ
- বিটুমিন
- ইলেকট্রনিক পণ্য
- কেমিক্যাল
- বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল
- মেয়াদোত্তীর্ণ বা ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য
দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় কিছু পণ্য ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে, ফলে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ও কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কনটেইনার জটের কারণে—
- নতুন আমদানি পণ্য রাখার জায়গা কমে যাচ্ছে।
- জাহাজ থেকে দ্রুত কনটেইনার নামানো কঠিন হচ্ছে।
- জাহাজকে অতিরিক্ত সময় বন্দরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
- শিপিং লাইনের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে।
- আমদানিকারকদের ডেমারেজ ও স্টোরেজ চার্জ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- রপ্তানি কার্যক্রমেও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে।
জট নিরসনে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ১৬৮টি কনটেইনারের পণ্য ই-অকশন (অনলাইন নিলাম) পদ্ধতিতে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। কর্তৃপক্ষের আশা, এতে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা পণ্য দ্রুত বিক্রি হবে এবং বন্দরের ইয়ার্ডে নতুন জায়গা তৈরি হবে। ভবিষ্যতে আরও বেশি কনটেইনার অনলাইন নিলামে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সম্প্রতি টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে বন্দরের কয়েকটি কনটেইনার ইয়ার্ডে পানি জমে যায়। এতে নিচু স্থানে রাখা কিছু কনটেইনার ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা কনটেইনার দ্রুত সরানো না গেলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
বন্দরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু নিলাম করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন—
- নিলাম প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা,
- কাস্টমসের আইনি জটিলতা কমানো,
- নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য খালাসে কঠোরতা,
- দীর্ঘদিন অখালাসকৃত কনটেইনার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সমন্বিত উদ্যোগ।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের মোট সমুদ্রপথে পরিচালিত বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই এই বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। তাই বন্দরের কার্যক্রমে সামান্য বিঘ্নও দেশের শিল্প, ব্যবসা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি দীর্ঘদিন ধরে অখালাসকৃত কনটেইনার জমে থাকায় আবারও বন্দরের ধারণক্ষমতা ও কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বন্দর ও কাস্টমস সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও হাজারো কনটেইনার বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড ও শেডে পড়ে রয়েছে। এসব কনটেইনারের একটি বড় অংশ নিলামের অপেক্ষায় থাকলেও আইনি জটিলতা, শুল্ক সংক্রান্ত বিরোধ, ভুল পণ্য ঘোষণা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিদিন নতুন কনটেইনার এলেও পুরোনোগুলো সরানো না যাওয়ায় ইয়ার্ডে চাপ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু বন্দরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। আমদানিকারকদের অনেকেই সময়মতো পণ্য খালাস করতে না পারায় অতিরিক্ত স্টোরেজ চার্জ ও ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে। শিল্পকারখানার কাঁচামাল দেরিতে পৌঁছানোর কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আর রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠাতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি দেশের রপ্তানি সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বন্দর ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কনটেইনারের মধ্যে অনেকগুলোর পণ্য ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে বা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কিছু কনটেইনারে রয়েছে শিল্পকারখানার যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক দ্রব্য, ইলেকট্রনিক পণ্য ও বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল। আবার কিছু ক্ষেত্রে ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তব পণ্যের মিল না থাকায় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কনটেইনার সরানো যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনলাইন নিলাম বা ই-অকশন ব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কনটেইনার দ্রুত বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত নিলাম কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে বন্দরের ইয়ার্ডে জায়গা খালি হবে এবং নতুন আমদানি পণ্য সংরক্ষণে সুবিধা হবে। একই সঙ্গে কাস্টমসের বিভিন্ন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যাতে পণ্য ছাড়ের সময় কমানো যায়।
এদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষও কনটেইনার ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নতুন ইয়ার্ড নির্মাণ, টার্মিনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল কনটেইনার ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু এবং কাস্টমসের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন সংকট কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না; অখালাসকৃত কনটেইনার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সময়মতো পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে না পারলে একই সমস্যা বারবার ফিরে আসবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যকারিতা দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বন্দরে কনটেইনার জট তৈরি হলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব বাজারে পণ্যের দামের ওপরও পড়তে পারে। তাই কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, শিপিং এজেন্ট এবং আমদানিকারকদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত এই সংকট নিরসনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে ই-নিলাম, ডিজিটাল কাস্টমস সেবা এবং দ্রুত পণ্য নিষ্পত্তির উদ্যোগ চলমান থাকলেও দীর্ঘদিনের জমে থাকা কনটেইনারের কারণে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছে, চলমান সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বন্দরের কনটেইনার জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।



























