ঢাকা ১০:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাবনার হোসিয়ারিশিল্প সংকটে, ভারত রপ্তানি বন্ধে বন্ধ হচ্ছে কারখানা

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ১২:২৬:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
  • ৫১২

ভারতে স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় সংকটে পড়েছে পাবনার হোসিয়ারি শিল্প। ছবি: এআই

পাবনার হোসিয়ারিশিল্প সংকটে পড়েছে ভারত স্থলপথে পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। একসময় যে শিল্পে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ছিল, এখন সেই শিল্পের অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা ঋণের বোঝায় চাপের মধ্যে পড়েছেন, আর শ্রমিকদের বড় অংশ হারিয়েছেন কাজ।

পাবনা শহরের সাধুপাড়া এলাকার হোসিয়ারি উদ্যোক্তা আরিফ হোসেন ব্যাংক ঋণ নিয়ে বড় একটি কারখানা গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর কারখানায় প্রায় ৪০০ শ্রমিক কাজ করতেন। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করে ভালো আয়ও করছিলেন। কিন্তু স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পর উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হন তিনি।

শুধু আরিফ হোসেন নন, একই সমস্যায় পড়েছেন পাবনার অসংখ্য হোসিয়ারি ব্যবসায়ী। জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় তিন হাজার হোসিয়ারি কারখানায় একসময় লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে রপ্তানি সংকটে প্রায় ৬৫ শতাংশ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

পাবনার হোসিয়ারিশিল্পের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। একসময় ইছামতী নদীপথে এই অঞ্চলের তৈরি পোশাক দেশের পাশাপাশি বিদেশেও পরিচিতি পেয়েছিল। পরে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঝুট কাপড়ভিত্তিক গেঞ্জি, শার্ট, সোয়েটার ও অন্যান্য পোশাক উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্পটি নতুনভাবে এগিয়ে যায়।

১৯৯০ সালের পর পাবনার হোসিয়ারি শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। ভারত, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এখানকার তৈরি পোশাক রপ্তানি হতে থাকে। স্থলপথে কম খরচে দ্রুত পণ্য পাঠানোর সুযোগ থাকায় ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারতেন।

তবে স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। আগে প্রতি সপ্তাহে শতাধিক ট্রাকে পণ্য ভারতে পাঠানো হতো। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে সাত-আট ট্রাকে নেমে এসেছে। নৌপথে পণ্য পাঠাতে খরচ বাড়ছে, সময়ও লাগছে বেশি।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আগে স্থলপথে পণ্য পাঠাতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগত এবং দ্রুত অর্থ পাওয়া যেত। এখন চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে পণ্য পাঠাতে ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। অর্থ পরিশোধ পেতেও এক মাসের বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।

পাবনার অনেক কারখানায় এখন উৎপাদিত পণ্যের মজুত পড়ে আছে। গুদামগুলোতে জমে আছে তৈরি পোশাক ও ঝুট কাপড়। অনেক কারখানায় শ্রমিক সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। যেসব শ্রমিক এখনো কাজ করছেন, তাঁদেরও আগের মতো ব্যস্ততা নেই।

সাধুপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, আগে ঝুট কাপড়ের চাহিদা ছিল অনেক বেশি। এখন বিক্রি কমে যাওয়ায় গুদামে বিপুল পরিমাণ কাপড় জমে আছে। বাধ্য হয়ে অনেক কর্মীকে ছাঁটাই করতে হয়েছে।

শ্রমিকদের অবস্থাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই কাজ হারিয়ে নতুন কর্মসংস্থানের সন্ধান করছেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ শ্রমিকরাও এখন পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের কর্মকর্তারা বলছেন, হোসিয়ারিশিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি জেলার ঐতিহ্যের অংশ। এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে রপ্তানি সুবিধা পুনরুদ্ধার ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাবনার হোসিয়ারিশিল্পকে বাঁচাতে বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ তৈরি করতে হবে। তা না হলে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পাবনার হোসিয়ারিশিল্প সংকটে, ভারত রপ্তানি বন্ধে বন্ধ হচ্ছে কারখানা

Update Time : ১২:২৬:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

পাবনার হোসিয়ারিশিল্প সংকটে পড়েছে ভারত স্থলপথে পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। একসময় যে শিল্পে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ছিল, এখন সেই শিল্পের অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা ঋণের বোঝায় চাপের মধ্যে পড়েছেন, আর শ্রমিকদের বড় অংশ হারিয়েছেন কাজ।

পাবনা শহরের সাধুপাড়া এলাকার হোসিয়ারি উদ্যোক্তা আরিফ হোসেন ব্যাংক ঋণ নিয়ে বড় একটি কারখানা গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর কারখানায় প্রায় ৪০০ শ্রমিক কাজ করতেন। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করে ভালো আয়ও করছিলেন। কিন্তু স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পর উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হন তিনি।

শুধু আরিফ হোসেন নন, একই সমস্যায় পড়েছেন পাবনার অসংখ্য হোসিয়ারি ব্যবসায়ী। জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় তিন হাজার হোসিয়ারি কারখানায় একসময় লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে রপ্তানি সংকটে প্রায় ৬৫ শতাংশ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

আরও পড়ুন  ইসলামী ব্যাংকে দ্রুতই এমডি নিয়োগ দেওয়া হবে : অর্থমন্ত্রী

পাবনার হোসিয়ারিশিল্পের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। একসময় ইছামতী নদীপথে এই অঞ্চলের তৈরি পোশাক দেশের পাশাপাশি বিদেশেও পরিচিতি পেয়েছিল। পরে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঝুট কাপড়ভিত্তিক গেঞ্জি, শার্ট, সোয়েটার ও অন্যান্য পোশাক উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্পটি নতুনভাবে এগিয়ে যায়।

১৯৯০ সালের পর পাবনার হোসিয়ারি শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। ভারত, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এখানকার তৈরি পোশাক রপ্তানি হতে থাকে। স্থলপথে কম খরচে দ্রুত পণ্য পাঠানোর সুযোগ থাকায় ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারতেন।

তবে স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। আগে প্রতি সপ্তাহে শতাধিক ট্রাকে পণ্য ভারতে পাঠানো হতো। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে সাত-আট ট্রাকে নেমে এসেছে। নৌপথে পণ্য পাঠাতে খরচ বাড়ছে, সময়ও লাগছে বেশি।

আরও পড়ুন  প্রতি ডিমে ৪ টাকা লোকসান, দাবি খামারিদের

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আগে স্থলপথে পণ্য পাঠাতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগত এবং দ্রুত অর্থ পাওয়া যেত। এখন চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে পণ্য পাঠাতে ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। অর্থ পরিশোধ পেতেও এক মাসের বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।

পাবনার অনেক কারখানায় এখন উৎপাদিত পণ্যের মজুত পড়ে আছে। গুদামগুলোতে জমে আছে তৈরি পোশাক ও ঝুট কাপড়। অনেক কারখানায় শ্রমিক সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। যেসব শ্রমিক এখনো কাজ করছেন, তাঁদেরও আগের মতো ব্যস্ততা নেই।

সাধুপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, আগে ঝুট কাপড়ের চাহিদা ছিল অনেক বেশি। এখন বিক্রি কমে যাওয়ায় গুদামে বিপুল পরিমাণ কাপড় জমে আছে। বাধ্য হয়ে অনেক কর্মীকে ছাঁটাই করতে হয়েছে।

আরও পড়ুন  বাংলাদেশ ১ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে নতুন পরিকল্পনা

শ্রমিকদের অবস্থাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই কাজ হারিয়ে নতুন কর্মসংস্থানের সন্ধান করছেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ শ্রমিকরাও এখন পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের কর্মকর্তারা বলছেন, হোসিয়ারিশিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি জেলার ঐতিহ্যের অংশ। এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে রপ্তানি সুবিধা পুনরুদ্ধার ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাবনার হোসিয়ারিশিল্পকে বাঁচাতে বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ তৈরি করতে হবে। তা না হলে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।