ঢাকা ০১:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বড় হয়েও মায়ের ওপর নির্ভরশীল? জানুন ‘মাদার কমপ্লেক্স’

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ১১:৫২:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
  • ৫২১

মায়ের প্রতি ভালোবাসা নাকি অতিনির্ভরশীলতা? জেনে নিন ‘মাদার কমপ্লেক্স’-এর বাস্তবতা।সংগৃহীত

অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও মায়ের মতামতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন প্রবণতার পেছনে কাজ করতে পারে ‘মাদার কমপ্লেক্স’ নামের একটি মনোবিশ্লেষণমূলক ধারণা। এটি কোনো মানসিক রোগ নয়, তবে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পর্ক এবং আত্মনির্ভরশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শৈশব থেকেই শিশুকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা।

শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ফেলো ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষের মতে, একজন মা সন্তানের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন। জন্মের পর থেকে বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে মায়ের স্নেহ, দিকনির্দেশনা ও উপস্থিতি শিশুর মানসিক বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। এই সম্পর্ক থেকেই ধীরে ধীরে অবচেতন মনে গড়ে ওঠে এক ধরনের মানসিক ছাপ, যাকে মনোবিশ্লেষণের ভাষায় ‘মাদার কমপ্লেক্স’ বলা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাকে ঘিরে শিশুর আবেগ, স্মৃতি, ভয়, প্রত্যাশা এবং অভিজ্ঞতা অবচেতন মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। এই প্রভাব বড় হওয়ার পরও পুরোপুরি মুছে যায় না। তবে এটি কোনো রোগ নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিত্ব ও মানসিক বিকাশের একটি স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। এমনকি যেসব শিশু মায়ের পরিবর্তে অন্য কোনো অভিভাবকের কাছে বড় হয়, তাদের ক্ষেত্রেও সেই ব্যক্তিকে কেন্দ্র করেই একই ধরনের মানসিক প্রভাব তৈরি হতে পারে।

সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন একজন ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিতে পারেন না। ছোট থেকে বড় প্রতিটি বিষয়ে যদি তিনি মায়ের মতামতের ওপর নির্ভরশীল থাকেন, তাহলে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিনির্ভরশীলতা একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ হয়তো নিজের বিয়ে, পেশা বা এমনকি মধুচন্দ্রিমার গন্তব্যও মায়ের অনুমতি ছাড়া ঠিক করতে পারেন না। আবার সংসারের ছোট-বড় নানা সিদ্ধান্তেও দ্বিধায় ভোগেন। এতে দাম্পত্য সম্পর্কেও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিস্থিতি এড়াতে শৈশব থেকেই শিশুকে কিছু বিষয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। কোন পোশাক পরবে, কোন খেলায় অংশ নেবে বা অবসরে কী করবে—এ ধরনের ছোট ছোট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। ভুল করলে তাকে শেখার সুযোগ দিতে হবে, কারণ ভুল থেকেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তৈরি হয়।

একই সঙ্গে শিশুকে নৈতিকতা, মানবিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণের শিক্ষা দিতে হবে। বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া না করা, প্রাণীদের কষ্ট না দেওয়া বা প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হওয়ার মতো বিষয়গুলো ছোটবেলা থেকেই শেখানো প্রয়োজন। এতে শিশুর মানসিক বিকাশ আরও ইতিবাচক হয় এবং ভবিষ্যতে সম্পর্ক পরিচালনায় সে বেশি দক্ষ হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন অভিভাবকের দায়িত্ব সন্তানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিজের হাতে নেওয়া নয়, বরং তাকে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে শেখানো। কারণ, ভবিষ্যতে সবসময় মা-বাবা পাশে থাকবেন না, কিন্তু তাদের শেখানো মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাস সন্তানের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পথ দেখাবে। তাই অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং ভালোবাসা, দিকনির্দেশনা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগই একটি শিশুকে আত্মনির্ভরশীল ও মানসিকভাবে সুস্থ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বড় হয়েও মায়ের ওপর নির্ভরশীল? জানুন ‘মাদার কমপ্লেক্স’

Update Time : ১১:৫২:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও মায়ের মতামতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন প্রবণতার পেছনে কাজ করতে পারে ‘মাদার কমপ্লেক্স’ নামের একটি মনোবিশ্লেষণমূলক ধারণা। এটি কোনো মানসিক রোগ নয়, তবে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পর্ক এবং আত্মনির্ভরশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শৈশব থেকেই শিশুকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা।

শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ফেলো ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষের মতে, একজন মা সন্তানের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন। জন্মের পর থেকে বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে মায়ের স্নেহ, দিকনির্দেশনা ও উপস্থিতি শিশুর মানসিক বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। এই সম্পর্ক থেকেই ধীরে ধীরে অবচেতন মনে গড়ে ওঠে এক ধরনের মানসিক ছাপ, যাকে মনোবিশ্লেষণের ভাষায় ‘মাদার কমপ্লেক্স’ বলা হয়।

আরও পড়ুন  গরমে কফিপ্রেমীদের নতুন পছন্দ, ইতালির অ্যাফোগাটো কফি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাকে ঘিরে শিশুর আবেগ, স্মৃতি, ভয়, প্রত্যাশা এবং অভিজ্ঞতা অবচেতন মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। এই প্রভাব বড় হওয়ার পরও পুরোপুরি মুছে যায় না। তবে এটি কোনো রোগ নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিত্ব ও মানসিক বিকাশের একটি স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। এমনকি যেসব শিশু মায়ের পরিবর্তে অন্য কোনো অভিভাবকের কাছে বড় হয়, তাদের ক্ষেত্রেও সেই ব্যক্তিকে কেন্দ্র করেই একই ধরনের মানসিক প্রভাব তৈরি হতে পারে।

সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন একজন ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিতে পারেন না। ছোট থেকে বড় প্রতিটি বিষয়ে যদি তিনি মায়ের মতামতের ওপর নির্ভরশীল থাকেন, তাহলে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিনির্ভরশীলতা একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

আরও পড়ুন  ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে যেসব খাবার নিয়মিত খাবেন

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ হয়তো নিজের বিয়ে, পেশা বা এমনকি মধুচন্দ্রিমার গন্তব্যও মায়ের অনুমতি ছাড়া ঠিক করতে পারেন না। আবার সংসারের ছোট-বড় নানা সিদ্ধান্তেও দ্বিধায় ভোগেন। এতে দাম্পত্য সম্পর্কেও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিস্থিতি এড়াতে শৈশব থেকেই শিশুকে কিছু বিষয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। কোন পোশাক পরবে, কোন খেলায় অংশ নেবে বা অবসরে কী করবে—এ ধরনের ছোট ছোট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। ভুল করলে তাকে শেখার সুযোগ দিতে হবে, কারণ ভুল থেকেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তৈরি হয়।

একই সঙ্গে শিশুকে নৈতিকতা, মানবিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণের শিক্ষা দিতে হবে। বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া না করা, প্রাণীদের কষ্ট না দেওয়া বা প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হওয়ার মতো বিষয়গুলো ছোটবেলা থেকেই শেখানো প্রয়োজন। এতে শিশুর মানসিক বিকাশ আরও ইতিবাচক হয় এবং ভবিষ্যতে সম্পর্ক পরিচালনায় সে বেশি দক্ষ হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন  সহজ ধাপে ডাবের শাঁসের কুলফি তৈরির সেরা রেসিপি

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন অভিভাবকের দায়িত্ব সন্তানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিজের হাতে নেওয়া নয়, বরং তাকে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে শেখানো। কারণ, ভবিষ্যতে সবসময় মা-বাবা পাশে থাকবেন না, কিন্তু তাদের শেখানো মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাস সন্তানের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পথ দেখাবে। তাই অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং ভালোবাসা, দিকনির্দেশনা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগই একটি শিশুকে আত্মনির্ভরশীল ও মানসিকভাবে সুস্থ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করে।