টিস্যু কালচার চারা এখন বাংলাদেশের কৃষিতে নীরব এক বিপ্লবের নাম। গবেষণাগারের ছোট্ট কাচের বোতলে জন্ম নেওয়া ক্ষুদ্র উদ্ভিদ টিস্যু কয়েক মাসের মধ্যেই রূপ নিচ্ছে হাজার হাজার রোগমুক্ত চারায়। এই প্রযুক্তির কারণে কলা, আনারস, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, অর্কিড, লিলিয়াম, জারবেরা ও স্টেভিয়ার মতো উচ্চমূল্যের ফসলের উন্নত চারা এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে বিদেশি চারার ওপর নির্ভরতা কমছে, আর কৃষকেরা তুলনামূলক কম খরচে উন্নত মানের চারা পাচ্ছেন।
দেশের কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক কৃষিতে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। একটি মাত্র সুস্থ মাতৃগাছের টিস্যু থেকে অল্প জায়গায় লাখ লাখ রোগমুক্ত চারা তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় উৎপাদনশীলতা বাড়ছে এবং রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি কমছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক কৃষিতে এই প্রযুক্তি আরও বড় ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহের আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব থেকে বিপুল পরিমাণ উন্নত চারা উৎপাদন হচ্ছে। মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টার ইতোমধ্যে সবচেয়ে বেশি চারা বিক্রি করে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। শুধু ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই প্রতিষ্ঠানটি দুই লাখের বেশি চারা বিক্রি করে সরকারের আয় করেছে ৫২ লাখ টাকারও বেশি। নতুন আরও আটটি জেলায় ল্যাব নির্মাণের কাজ শেষ হলে বছরে প্রায় এক কোটি রোগমুক্ত চারা উৎপাদনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন হবে।
মাঠপর্যায়ে এই প্রযুক্তির সুফলও স্পষ্ট। জি-৯ জাতের কলার প্রতিটি ছড়িতে যেখানে ৩০০টির কাছাকাছি কলা পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে প্রচলিত জাতের কলায় ফলন অনেক কম। অন্যদিকে জারবেরা ফুলের মতো বাণিজ্যিক চাষেও দেশীয় টিস্যু কালচার চারা ব্যবহার করে উদ্যোক্তারা কম খরচে ভালো লাভ করছেন। আগে যে চারা বিদেশ থেকে বেশি দামে আমদানি করতে হতো, এখন সেটিই দেশেই সহজে পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের ৭৬টি হর্টিকালচার সেন্টার থেকে গত অর্থবছরে চারা বিক্রি করে সরকারের আয় হয়েছে ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং উন্নত মানের চারা উৎপাদনের সমন্বয়ে দেশের কৃষি এখন নতুন এক সম্ভাবনার পথে এগোচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশা, টিস্যু কালচার প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলে বাংলাদেশের কৃষি আরও প্রতিযোগিতামূলক ও লাভজনক হয়ে উঠবে।
বিদেশি চারার বিকল্প হিসেবে দেশীয় টিস্যু কালচার চারা ইতোমধ্যে কৃষক ও উদ্যোক্তাদের আস্থা অর্জন করেছে। উৎপাদন ব্যয় কমানো, রোগমুক্ত চারা নিশ্চিত করা এবং ফলন বাড়ানোর মাধ্যমে এই প্রযুক্তি দেশের বাণিজ্যিক কৃষিকে আরও টেকসই ও আধুনিক করে তুলছে। আগামী কয়েক বছরে নতুন ল্যাব চালু হলে কৃষি খাতে এর ইতিবাচক প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
























