একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং নাগরিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকল্প নেই। উন্নত বিশ্বে স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল একটি মৌলিক অধিকার নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার রোগী বিদেশমুখী হচ্ছেন, যা দেশের স্বাস্থ্যখাতের সক্ষমতা, অবকাঠামো এবং সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার পেছনে শুধু আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি নয়; রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সীমিত প্রাপ্যতা, উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং চিকিৎসা সেবার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
১১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে ব্যয় হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, “আমরা কেন সেই চিকিৎসা নিজেদের দেশেই দিতে পারব না? কেন জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারব না?“
তিনি বলেন, আধুনিক হাসপাতাল, উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি, গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসা, দক্ষ জনবল এবং চিকিৎসকদের মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের মানুষ দেশেই উন্নত চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত চিকিৎসক ডা. জুবাইদা রহমান স্বাস্থ্যখাতের আধুনিকায়ন, চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং দক্ষ চিকিৎসক তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, অতীতের সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। তার মতে, বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবের কারণে সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি স্বাস্থ্যখাতকে পুনর্গঠনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন।
স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশে চিকিৎসার প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—
- উন্নত ক্যানসার, হৃদরোগ ও অঙ্গ প্রতিস্থাপন চিকিৎসার সীমিত সুযোগ।
- আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতির ঘাটতি।
- সরকারি হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ।
- রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে চিকিৎসাকর্মীদের যোগাযোগের ঘাটতি।
- মানসম্মত ডায়াগনস্টিক সেবা ও গবেষণার সীমাবদ্ধতা।
- বেসরকারি হাসপাতালের উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে প্রয়োজন—
- জেলা পর্যায়ে আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা।
- চিকিৎসা গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
- আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজন।
- চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ।
- ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ও ই-হেলথ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।
- সরকারি হাসপাতালে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ।
- রোগীকেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা চালু করা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা গেলে বিদেশে চিকিৎসার প্রবণতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।



























