বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের শরীর তাপের সঙ্গে ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া করে। হরমোনের পরিবর্তন, শরীরের গঠন এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কারণে গরমের প্রভাব নারীদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে।
মেয়েদের বেশি গরম লাগার প্রধান কারণগুলো—
● হরমোনের পরিবর্তনই অন্যতম কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের বেশি গরম লাগার সবচেয়ে বড় কারণ হলো হরমোনের স্বাভাবিক ওঠানামা। ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দুই হরমোনের ভারসাম্য পরিবর্তিত হলে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রাও প্রভাবিত হয়।
মাসিক চক্র, গর্ভাবস্থা, পেরিমেনোপজ ও মেনোপজের সময় হরমোনের পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি হয়। ফলে এ সময় শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে এবং গরমের অনুভূতিও বেড়ে যায়।
● ঘাম কম হওয়ায় শরীর দ্রুত ঠান্ডা হতে পারে না
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের শরীরে ঘাম নিঃসরণ কিছুটা কম হয় এবং তুলনামূলক বেশি তাপমাত্রায় ঘাম বের হতে শুরু করে। তাই শরীরের অতিরিক্ত তাপ দ্রুত বের হতে পারে না।
এ ছাড়া নারীদের শরীরে চর্বির পরিমাণও তুলনামূলক বেশি থাকে। এই চর্বি শরীরের তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে। ফলে গরম পরিবেশে অস্বস্তি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হতে পারে।
● মাসিকের সময় গরম বেশি লাগতে পারে
মাসিক শুরুর আগে প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পায়। এ সময় অনেক নারী স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি গরম অনুভব করেন।
আবার মাসিক চলাকালে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় শরীরকে ঠান্ডা রাখতে হৃদ্যন্ত্রকে বেশি কাজ করতে হয়। এ কারণে ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, অনিদ্রা ও অবসাদের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
● আয়রনের ঘাটতিও বাড়াতে পারে অস্বস্তি
মাসিকের সময় রক্তক্ষরণের কারণে শরীর থেকে কিছু পরিমাণ আয়রন বেরিয়ে যায়। আয়রনের ঘাটতি হলে শরীরে অক্সিজেন পরিবহন ব্যাহত হতে পারে, যার প্রভাব পড়ে হৃদ্যন্ত্র ও রক্ত সঞ্চালনে।
প্রচণ্ড গরমের সময় এই পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ফলে অনেকের দুর্বলতা, অবসাদ ও শারীরিক ক্লান্তি বেড়ে যায়।
● মেনোপজে হট ফ্ল্যাশের সমস্যা বাড়ে
পেরিমেনোপজ ও মেনোপজে থাকা নারীদের মধ্যে হট ফ্ল্যাশ এবং রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। এর মূল কারণ ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়া।
তাপপ্রবাহের সময় এই উপসর্গ আরও তীব্র হতে পারে। ফলে অনেকের ঘুমের সমস্যা, বিরক্তি ও শারীরিক অস্বস্তিও বেড়ে যায়।
● গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত গরম কেন ঝুঁকিপূর্ণ
গর্ভাবস্থায় শরীরের বিপাকক্রিয়া বেড়ে যায় এবং পানির চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে শরীরের ভেতরে শিশুর বৃদ্ধি পাওয়ায় হৃদ্যন্ত্র ও রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরম বা হিট স্ট্রেস মা ও গর্ভের শিশুর উভয়ের জন্যই ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই গর্ভবতী নারীদের গরমে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
● বয়স ও জীবনযাপনের প্রভাবও রয়েছে
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায়। অনেক সময় তৃষ্ণা অনুভবের প্রবণতাও কমে, ফলে শরীরে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে।
এ ছাড়া অনেক নারী পরিবারের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকায় নিজের বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি পান বা স্বাস্থ্যসেবার দিকে প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিতে পারেন না। এটিও গরমজনিত সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
● হিট এক্সজশন ও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি
অতিরিক্ত গরমে শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে গেলে হিট এক্সজশন হতে পারে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, পেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
সময়ে চিকিৎসা না নিলে এটি হিট স্ট্রোকে রূপ নিতে পারে, যা জীবনহানির কারণও হতে পারে। তাই এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ঠান্ডা স্থানে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
● গরমে সুস্থ থাকতে যা করবেন
- পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার পান করুন।
- হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরুন।
- দীর্ঘ সময় রোদে অবস্থান এড়িয়ে চলুন।
- প্রয়োজন হলে ওআরএস বা ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয় পান করুন।
- মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগলে দ্রুত ঠান্ডা স্থানে বিশ্রাম নিন।
- উপসর্গ গুরুতর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সূত্র: বিবিসি


























