রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ইয়াসমিন আরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু পাঠদানেই নয়, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ও একাডেমিক উন্নয়নে আন্তরিক ভূমিকার জন্যও পরিচিত। কিন্তু হঠাৎ করেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার খবর তার পরিবার, সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই তাকে নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হচ্ছে এবং ধাপে ধাপে বিভিন্ন চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াসমিন আরার শরীরে থার্ড স্টেজ ক্যান্সার ধরা পড়েছে। পরবর্তীতে পরীক্ষায় দেখা যায়, রোগটি লিম্ফ নোডেও ছড়িয়ে পড়েছে, ফলে তার চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে ওঠে। এ কারণে তাকে দীর্ঘমেয়াদি ওরাল কেমোথেরাপি গ্রহণ করতে হচ্ছে। চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত ফলোআপ, রক্ত পরীক্ষা, স্ক্যান এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শও নিতে হচ্ছে।
ইয়াসমিন আরা জানান, ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু হওয়ার পর থেকে তার পরিবারের আর্থিক চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। একটি ইনজেকশনের মূল্য প্রায় এক লাখ টাকা, আর প্রতি মাসে ওরাল কেমোথেরাপির ওষুধের জন্য ব্যয় করতে হচ্ছে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাসপাতালের খরচ, প্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষা, যাতায়াত ও অন্যান্য চিকিৎসা ব্যয়। সব মিলিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া পরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, অসুস্থ হওয়ার আগে প্রতিদিন নিয়মিত ক্লাস নিতেন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগত। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর শারীরিক দুর্বলতা বেড়ে গেলেও যতদিন সম্ভব তিনি ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কারণ শিক্ষার্থীদের মুখে হাসি দেখাই তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা।
ইয়াসমিন আরা আরও বলেন, চিকিৎসা চলাকালে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পরিবার, সহকর্মী, শিক্ষার্থী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের দোয়া ও সহযোগিতা তাকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তিনি আশা করেন, চিকিৎসা শেষে আবারও সুস্থ হয়ে শ্রেণিকক্ষে ফিরে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে পারবেন।
এই পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে তার চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগ শুধু চিকিৎসা ব্যয় বহনে সহায়ক হয়নি, বরং ইয়াসমিন আরা ও তার পরিবারের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশনের চিফ কো-অর্ডিনেটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, অসহায় ও সংকটাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো ফাউন্ডেশনের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় ইয়াসমিন আরার চিকিৎসায় সহায়তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতেও সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও সংকটাপন্ন মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ক্যান্সারের মতো ব্যয়বহুল রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষ অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। তাই সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এমন রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
চিকিৎসা সহায়তা পাওয়ার পর আবেগাপ্লুত ইয়াসমিন আরা বলেন, এই সহযোগিতা তার জন্য শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, বরং নতুন করে বেঁচে থাকার শক্তি ও সাহস। তিনি মনে করেন, মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসই তাকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সারের চিকিৎসা শুধু ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের ওপর নির্ভর করে না; রোগীর মানসিক শক্তি, পরিবারের সমর্থন এবং সমাজের সহযোগিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ একজন রোগীর চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে যেমন সহায়ক হয়, তেমনি তার মানসিক দৃঢ়তাও বাড়িয়ে তোলে।
বর্তমানে ইয়াসমিন আরার চিকিৎসা চলমান রয়েছে। তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন, যাতে দ্রুত সুস্থ হয়ে আবারও তার প্রিয় পেশা শিক্ষকতায় ফিরতে পারেন এবং আগের মতোই শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে পারেন।




























