শেখ হাসিনার দেশত্যাগ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার টানা আন্দোলনের মুখে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর সেদিন ক্ষমতার পালাবদল ঘটে এবং দেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়।
২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার টানা প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় ছিল। এই সময় নির্বাচন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরলেও বিরোধীরা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হওয়া, দুর্নীতি এবং জবাবদিহির সংকটের অভিযোগ করে আসছিল।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে এই আন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে সহিংসতা, প্রাণহানি এবং সংঘর্ষের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়।
১৭ জুলাই রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সরকার কারফিউ জারি করে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। একই সময়ে শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাতে শুরু করেন।
প্রথমদিকে আন্দোলনকারীরা ৯ দফা দাবি উত্থাপন করলেও পরে তা এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। ৩ আগস্ট রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সরকারের পদত্যাগের দাবি ঘোষণা করা হয়। পরে ৫ আগস্ট মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির ডাক দেওয়া হলে রাজধানীমুখী মানুষের ঢল নামে। আন্দোলনের গতি ও জনসমর্থন ক্রমেই বাড়তে থাকে।
৫ আগস্ট দুপুরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর প্রকাশিত হয়। পরে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এর পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ বিজয় মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেয়। এই ঘটনাকে অনেকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বড় মোড় হিসেবে বিবেচনা করেন।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগ শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘ আন্দোলন, আত্মত্যাগ এবং জনমতের প্রতিফলন হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হিসেবে আলোচিত এবং ভবিষ্যতেও এই দিনকে ঘিরে নানা বিশ্লেষণ ও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।























