মাইক্রোপ্লাস্টিক এবার উঠে এসেছে হৃদ্স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন এক গবেষণার আলোচনায়। ইতালির গবেষকদের একটি ছোট পরিসরের গবেষণায় দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাকের নির্দিষ্ট ধরনের রোগীদের করোনারি রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ধূমপান ও বায়ুদূষণের সংস্পর্শের সঙ্গেও এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষণাটি ইতালির রোমের সাপিয়েঞ্জা ইউনিভার্সিটির গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় এবং ১৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে European Heart Journal-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে করোনারি এনজিওগ্রাফির জন্য আসা ৬১ জন রোগীর রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের হার্ট অ্যাটাক, দীর্ঘস্থায়ী করোনারি সিনড্রোম এবং স্বাভাবিক করোনারি ধমনির তিনটি দলে ভাগ করা হয়েছিল।
ফলাফলে দেখা যায়, ST-segment elevation myocardial infarction বা STEMI-তে আক্রান্ত ১৯ জনের মধ্যে ১৬ জনের, অর্থাৎ প্রায় ৮৪ শতাংশের রক্তে মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী করোনারি সিনড্রোমের রোগীদের মধ্যে এই হার ছিল ৪০ শতাংশ। আর স্বাভাবিক করোনারি ধমনি থাকা নিয়ন্ত্রণ দলের প্রায় ৩২ শতাংশের রক্তে এসব কণা পাওয়া যায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব রোগীর রক্তে মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে ধূমপানের ইতিহাস এবং বেশি মাত্রার PM2.5 বায়ুদূষণের সংস্পর্শ তুলনামূলক বেশি ছিল। পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে ধূমপানের ইতিহাসকে রক্তে এসব কণা শনাক্ত হওয়ার একটি স্বাধীন পূর্বাভাসকারী হিসেবে পাওয়া গেছে।
তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। এই গবেষণা থেকে বলা যায় না যে মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি হার্ট অ্যাটাক ঘটায়। গবেষণাটি ছিল পর্যবেক্ষণভিত্তিক এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা মাত্র ৬১ জন। তাই মাইক্রোপ্লাস্টিক হৃদ্রোগের কারণ কি না, নাকি অন্য কোনো কারণের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণার লেখকরাও বিষয়টিকে সম্ভাব্য সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
গবেষকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, STEMI রোগীদের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির পাশাপাশি প্রদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু বায়োমার্কারও বেশি ছিল। বিশেষ করে IL-6 ও TNF-α-এর মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া যায়। এতে গবেষকেরা ধারণা করছেন, এসব ক্ষুদ্র কণা শরীরে প্রদাহজনিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাও আরও গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষণায় সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া প্লাস্টিক ছিল পলিইথিলিন। গবেষকেরা রক্তের পাশাপাশি করোনারি রক্তেও এসব কণার উপস্থিতি পরীক্ষা করেছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে করোনারি রক্তে ঘনত্ব বেশি পাওয়া গেছে। এই পর্যবেক্ষণ হৃদ্রোগ ও পরিবেশগত দূষণের সম্পর্ক নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণার নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
এদিকে ধূমপানের ক্ষতি নিয়ে নতুন করে বলার অপেক্ষা নেই। ধূমপান হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্ত। নতুন গবেষণাটি সেই ঝুঁকির আলোচনায় পরিবেশগত দূষণ ও প্লাস্টিক কণার সম্ভাব্য ভূমিকার বিষয়টিও সামনে এনেছে।
তাই এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো আতঙ্কিত হওয়া নয়, বরং ঝুঁকি কমানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া। ধূমপান এড়িয়ে চলা, বায়ুদূষণের সংস্পর্শ কমানো এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর গবেষণার ফলকে চূড়ান্ত চিকিৎসা-সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের একটি নতুন ধাপ হিসেবে দেখা উচিত।


























