আদিবাসী দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য পারস্পরিক সম্মানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন যুগান্তর সম্পাদক ও কবি আবদুল হাই শিকদার। তিনি বলেছেন, দেশের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সম্মান করেই সবাইকে সমান অধিকার, মর্যাদা ও সম্মানের ভিত্তিতে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। তাঁর মতে, পরিচয়ের বৈচিত্র্যকে অস্বীকার নয়, বরং স্বীকৃতি দিয়েই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।
সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবদুল হাই শিকদার বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয় ধরে রাখার সুযোগ থাকতে হবে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল—বাঙালি তার পরিচয়ে থাকবে, চাকমা তার পরিচয়ে থাকবে; কিন্তু সবাই একই রাষ্ট্রীয় ছাতার নিচে নাগরিক হিসেবে বসবাস করবে। তিনি মনে করেন, পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থানই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি।
আদিবাসী দিবসের আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গও উঠে আসে। আবদুল হাই শিকদার বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও অংশ নিয়েছেন। তবে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে সবাইকে এককভাবে ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছিল। তাই রাষ্ট্রের পরিচয়ের সঙ্গে নাগরিকদের নিজস্ব জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মর্যাদাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য থেকেও সম্প্রীতির শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, নজরুল জাতি, ধর্ম ও বর্ণের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সবার জন্য লিখেছেন। এক সম্প্রদায়কে তুলে ধরতে গিয়ে অন্য সম্প্রদায়কে ছোট করেননি। এই সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা ও স্বার্থ যেমন সুরক্ষিত করা দরকার, তেমনি সেখানে বসবাসরত বাঙালিদের সমস্যারও সমাধান প্রয়োজন।
সেমিনারে বক্তারা ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি, মানবাধিকার ও আত্মপরিচয়ের বিভিন্ন সংকট নিয়ে আলোচনা করেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন জাতিসত্তার ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে গবেষণা এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকীও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। জাতিসংঘও ৯ আগস্টের আন্তর্জাতিক দিবসের মাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে।
আদিবাসী দিবসের এবারের সেমিনারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘আদিবাসী ধাত্রীদের জীবনমান সুরক্ষায় অবদান’। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জনজাতিসমূহের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা, সমতলের আদিবাসীদের ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অধিকার নিয়ে একাধিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। আলোচকদের বক্তব্যে উঠে আসে—বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। পারস্পরিক মৈত্রী, সহমর্মিতা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একটি শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

























