গ্যাস সংকট এবার সরাসরি আঘাত করেছে নিত্যপণ্যের উৎপাদনে। নারায়ণগঞ্জে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চিনি, গম, সয়াবিনবীজ ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্য প্রক্রিয়াজাতের ১২টি কারখানা রয়েছে। কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় এসব কারখানায় উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছিল। কিন্তু বুধবার পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে একে একে বন্ধ হয়ে যায় সয়াবিনবীজ মাড়াই, তেল উৎপাদন, আটা-ময়দা ও অন্যান্য নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতের কারখানাগুলো। ফলে দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এমজিআইয়ের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীর উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে চিনি, গম, ভোজ্যতেলসহ সাতটি প্রধান পণ্য ও কাঁচামালের মোট আমদানির প্রায় ২২ শতাংশ এসেছে এই শিল্পগোষ্ঠীর মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, তাদের কারখানাগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার টন এবং বছরে প্রায় ৩৩ লাখ টন নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত হয়। অর্থাৎ কয়েক দিনের উৎপাদন বন্ধ থাকলেও এর প্রভাব শুধু কারখানার ভেতরে নয়, বাজারের সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।
তবে গ্যাস সংকটের চিত্র শুধু এমজিআইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের আরও কয়েকটি বড় নিত্যপণ্য আমদানিকারক ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের কারখানাতেও উৎপাদন বন্ধ অথবা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। কোথাও কারখানা পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও আবার বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছে। টি কে গ্রুপের ২৮টি প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার মধ্যে ২০টি বন্ধ থাকার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। স্মাইল ফুড প্রোডাক্টসের চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের বড় তিনটি কারখানাও গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে। সীকম গ্রুপের ডেল্টা এগ্রোফুডের তিনটি কারখানাতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এর পেছনে মূল কারণ জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের বড় ঘাটতি। দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ থেকে ৩৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও বুধবার সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২০৩ কোটি ঘনফুটে। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ৬ আগস্ট আংশিকভাবে চালু হলেও সেটি পুরো সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ, শিল্পকারখানা ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে। শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখতে পারছে না।
গ্যাস সংকটের মধ্যেও আপাতত বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ বিপর্যয় হয়নি। কারণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুদামে আগে থেকে মজুত থাকা প্রক্রিয়াজাত পণ্য বাজারে ছাড়া হচ্ছে। শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, এক-দুই দিনের উৎপাদন বন্ধ থাকলে মজুত দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সংকট দীর্ঘায়িত হলে সেই মজুতও দ্রুত কমে যাবে। তখন নতুন করে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। নিত্যপণ্যের মতো সংবেদনশীল বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে সরবরাহের পাশাপাশি দামেও চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিকল্প জ্বালানি দিয়ে কিছু কারখানা চালানো গেলেও এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে এবং পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে খরচ বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ, সংকটের সময়ে নিত্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। পাশাপাশি বাজারে কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত দাম বাড়ানোর সুযোগ যেন কেউ নিতে না পারে, সেজন্য নজরদারি জোরদার করাও জরুরি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—গ্যাস সংকট কতদিন চলবে, আর তার প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারে কতটা পড়বে।



























