বেশি কাজ করার জন্য বা অন্য কোনো ব্যস্ততায় ঘুম বাদ দেওয়া সেই মুহূর্তে একেবারে নিরীহ একটি বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু আপনি হয়তো টেরই পাচ্ছেন না যে, আপনার হৃদপিণ্ড নীরবে এর বিশাল মূল্য দিচ্ছে। অনেকেই ইন্টারনেটে খোঁজেন কম ঘুমালে কী হয়। এর সহজ উত্তর হলো, ধারাবাহিকভাবে প্রতি রাতে ছয় ঘণ্টার কম ঘুমানো ধীরে ধীরে হৃদরোগের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ঘুম কেবল শরীরের ক্লান্তি দূর বা বিশ্রামের জন্য নয়, এটি এমন অনেক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যা আমাদের কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমকে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। তাই দীর্ঘস্থায়ী কম ঘুম হৃদপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
৬ ঘণ্টার কম ঘুমানোর মারাত্মক ঝুঁকিগুলো
প্রতিনিয়ত ছয় ঘণ্টার কম ঘুমালে শরীরে বেশ কয়েকটি নীরব ঘাতক রোগ বাসা বাঁধতে শুরু করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ধীরে ধীরে উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং করোনারি আর্টারি ডিজিজের সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া। এছাড়াও অনিয়মিত হৃদস্পন্দন এবং হঠাৎ স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এর পাশাপাশি টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে, যা স্বাধীনভাবেই একজন মানুষের কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। সেই সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি এবং স্থূলতার সমস্যা দেখা দেয়, আর এই দুটি বিষয়ই মূলত হৃদপিণ্ডের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা কী বলে?
ঘুমের অভাবের এই ক্ষতিকর দিকগুলো কেবল সাধারণ চিকিৎসকদের মুখের কথা নয়, বরং এটি বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত সত্য। ‘আমেরিকান জার্নাল অফ প্রিভেন্টিভ কার্ডিওলজি’-তে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, কম ঘুমের সঙ্গে হৃদরোগজনিত মৃত্যু, কার্ডিওমেটাবলিক ঝুঁকি এবং করোনারি আর্টারি ডিজিজের একটি শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউরোসায়েন্স’-এ প্রকাশিত ২০২৫ সালের আরেকটি গবেষণায় ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন এক্সামিনেশন সার্ভে-র তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, ঘুমের সময়কাল এবং ব্যাঘাতসহ ঘুম সম্পর্কিত অন্যান্য কারণগুলো একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকির সাথে তাৎপর্যপূর্ণভাবে যুক্ত।
অপর্যাপ্ত ঘুম কীভাবে হৃদপিণ্ডকে ধ্বংস করে?
অপর্যাপ্ত ঘুম শরীরের স্বাভাবিক রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে চরমভাবে ব্যাহত করে। সাধারণত গভীর ঘুমের সময় মানুষের রক্তচাপ সামান্য কমে গিয়ে হৃদপিণ্ড কিছুটা বিশ্রাম পায়। কিন্তু ক্রমাগত এই হ্রাস না ঘটলে তা ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্তচাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া কম ঘুমালে কী হয় তার আরেকটি বড় উদাহরণ হলো, এটি শরীরে কর্টিসলের মতো ক্ষতিকর স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এই স্ট্রেস হরমোন সরাসরি রক্তনালী এবং হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে হৃৎস্পন্দনের ছন্দপতন ঘটায়।
শারীরিক প্রদাহ ও বিপাকীয় পরিবর্তন
ঘুমের ঘাটতি কেবল হৃদপিণ্ড নয়, পুরো শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াকেই এলোমেলো করে দেয়। ঘুমের অভাব শরীরে প্রদাহ (Inflammation) বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, যা মানবদেহের ধমনীর ক্ষতি করে এবং হৃদরোগের একটি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও অপর্যাপ্ত ঘুম রক্তে শর্করা বা সুগারের মাত্রা এবং ক্ষুধার হরমোন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শরীরের প্রাকৃতিক ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। যার ফলে পরোক্ষভাবে ওজন বৃদ্ধি পায় এবং শরীরের বিপাকীয় বা মেটাবলিক পরিবর্তনের মাধ্যমে কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
সুস্থ থাকতে আদর্শ ঘুমের পরিমাণ কত?
শরীর সুস্থ রাখতে এবং হৃদপিণ্ডকে ভালো রাখতে কতটুকু ঘুম প্রয়োজন, তা নিয়ে অনেকেরই দ্বিধা থাকে। হৃদস্বাস্থ্য বিষয়ক বিশ্বের বেশিরভাগ স্বাস্থ্য নির্দেশিকাই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতি রাতে অন্তত সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানোর জোরালো পরামর্শ দেয়। চিকিৎসকদের মতে, সাত থেকে নয় ঘণ্টার এই ঘুমের সময়কালটি সাধারণত সর্বনিম্ন কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় বারবার এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, এর চেয়ে অনেকটা কম সময় ঘুমালে যেমন হৃদযন্ত্র-সম্পর্কিত ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, তেমনি প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বেশি সময় ধরে ঘুমালেও তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই হৃদরোগ থেকে বাঁচতে সঠিক নিয়মে ঘুমানো অত্যন্ত জরুরি।



























