চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নতুন মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ তুঙ্গে। ২০২৬-২৭ মৌসুমের লিগপর্বে এবার থাকছে ৩৬টি দল। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর সঙ্গে নতুন কিছু মুখ যুক্ত হওয়ায় ড্রয়ের আগেই তৈরি হয়েছে বাড়তি উত্তেজনা। বৃহস্পতিবার মোনাকোর গ্রিমালদি ফোরামে অনুষ্ঠিত হবে কাঙ্ক্ষিত ড্র।
দুই মৌসুম আগে প্রতিযোগিতায় বড় পরিবর্তন এনে দলসংখ্যা ৩৬ করা হয়েছিল। এবারও সেই নতুন কাঠামোতেই হবে লিগপর্ব। আগের মতো নির্দিষ্ট গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলার বদলে সব দল একটি সম্মিলিত পয়েন্ট তালিকায় থাকবে। প্রতিটি ক্লাব মোট আটটি ম্যাচ খেলবে। এর মধ্যে চারটি ম্যাচ নিজেদের মাঠে এবং চারটি খেলতে হবে প্রতিপক্ষের মাঠে।
ড্রয়ের নিয়মও এবার বেশ আকর্ষণীয়। ৩৬টি দলকে পারফরম্যান্স ও উয়েফা প্রতিযোগিতায় গত পাঁচ মৌসুমের ফলাফলের ভিত্তিতে চারটি পটে রাখা হয়েছে। প্রতিটি দল চারটি পট থেকেই দুটি করে প্রতিপক্ষ পাবে। ফলে প্রথম পটে থাকা কোনো দলও একাধিক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে পারে।
পট-১-এ রয়েছে ইউরোপের সবচেয়ে বড় নামগুলো। টানা দুই মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন পিএসজির সঙ্গে আছে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, লিভারপুল, বায়ার্ন মিউনিখ, ম্যানচেস্টার সিটি, আর্সেনাল, ইন্টার মিলান ও আতলেতিকো মাদ্রিদ। অর্থাৎ শুরু থেকেই সম্ভাব্য বড় ম্যাচের দরজা খোলা থাকছে।
বিশেষ নজর থাকবে পট-২-এর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ঘিরে। দুই বছর পর আবারও মূলপর্বে ফিরেছে ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি। একই পটে আছে ইউরোপা লিগজয়ী অ্যাস্টন ভিলা, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড, পোর্তো, রোমা ও স্পোর্টিং সিপির মতো পরিচিত দল। ফলে দ্বিতীয় পটও মোটেও সহজ নয়।
পট-৩-এ রয়েছে ফেইনুর্দ, লিলে, নাপোলি, আরবি লাইপজিগ, ভিয়ারিয়াল ও গালাতাসারাইয়ের মতো ক্লাব। তবে এই পটের সবচেয়ে আলোচিত দলগুলোর একটি বোডো/গ্লিম্ট। গত মৌসুমে বড় কয়েকটি ক্লাবকে হারিয়ে তারা নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছিল। তাই ড্রয়ে তাদের পাওয়া বড় দলগুলোর জন্য স্বস্তির কারণ নাও হতে পারে।
প্লে-অফ পেরিয়ে শেষ মুহূর্তে মূলপর্ব নিশ্চিত করা কয়েকটি দলও নজর কেড়েছে। ফেনারবাচে দুই লেগ মিলিয়ে লিঁওকে ৩-২ গোলে হারিয়ে বহু বছর পর বাছাইপর্বের বাধা পেরিয়েছে। গ্রিসের এএইকে এথেন্সও গুরুত্বপূর্ণ জয় তুলে নিয়ে মূলপর্বে জায়গা করে নিয়েছে।
পট-৪-এ আছে আরও কিছু চমক। নরওয়ের ভাইকিং প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মূলপর্বে উঠেছে। প্লে-অফে দিনামো জাগরেবকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে তারা ইতিহাস গড়েছে। শেষ ম্যাচেও ৩-১ গোলের জয় তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই পটে রয়েছে তিন অভিষিক্ত দল সাবাহ, লাস্ক ও কোমোও। বিশেষ করে কোমোর উপস্থিতি আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে। ইতালিয়ান ক্লাবটির কোচ হিসেবে দায়িত্বে আছেন সাবেক চ্যাম্পিয়ন্স লিগ রানার্সআপ সেস্ক ফাব্রেগাস। প্রথমবারের মতো ইউরোপের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব প্রতিযোগিতায় কোমোর যাত্রা তাই বেশ আলোচিত।
নতুন ফরম্যাটে শুধু ম্যাচের সংখ্যা নয়, পয়েন্টের গুরুত্বও অনেক বেশি। লিগপর্ব শেষে শীর্ষ আট দল সরাসরি শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেবে। ৯ থেকে ২৪ নম্বরে থাকা দলগুলোকে নকআউট পর্বের প্লে-অফ খেলতে হবে। আর নিচের দিকে থাকা দলগুলোর ইউরোপীয় অভিযান সেখানেই শেষ হয়ে যাবে।
এই কাঠামোর কারণে প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বড় কোনো দলের বিপক্ষে একটি জয় যেমন সরাসরি শেষ ষোলোয় যাওয়ার পথ সহজ করে দেবে, তেমনি দুর্বল প্রতিপক্ষের কাছে পয়েন্ট হারানোও শেষ পর্যন্ত বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই লিগপর্বে দলগুলোর শুরুটা ভালো হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্য সম্ভাব্য বড় ম্যাচ। পটের নিয়ম অনুযায়ী শক্তিশালী দলগুলোর সামনে একাধিক কঠিন প্রতিপক্ষ আসতে পারে। ফলে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, পিএসজি, লিভারপুল কিংবা ম্যানচেস্টার সিটির মতো দলগুলোর জন্য ড্রয়ের ফলাফল মৌসুমের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো দ্বিতীয় পটের দলগুলোর জন্যও ড্র গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ বিরতির পর মূলপর্বে ফিরে তারা কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। অ্যাস্টন ভিলার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন। ইউরোপা লিগ জয়ের পর এবার আরও বড় মঞ্চে তাদের সামর্থ্যের পরীক্ষা হবে।
তবে শুধু বড় ক্লাব নয়, ছোট ও নতুন দলগুলোর গল্পও এই মৌসুমকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। ভাইকিং, কোমো, সাবাহ কিংবা লাস্কের মতো দলগুলো নিজেদের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু করছে। বড় বাজেটের ক্লাবগুলোর বিপক্ষে তাদের ম্যাচগুলো হতে পারে লিগপর্বের অন্যতম চমক।
সব মিলিয়ে এবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে পুরোনো শক্তির পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জও থাকছে। চার পটে সাজানো ৩৬ দলের ড্র থেকেই অনেকটা বোঝা যাবে কার সামনে কেমন পথ অপেক্ষা করছে। এরপর আট ম্যাচের লিগপর্বে পয়েন্টের লড়াই হবে আরও তীব্র।
ফুটবলপ্রেমীদের চোখ এখন মোনাকোর ড্র অনুষ্ঠানের দিকে। কার সঙ্গে কার দেখা হচ্ছে, কোন দল পাচ্ছে কঠিন প্রতিপক্ষ আর কার ভাগ্যে তুলনামূলক সহজ সূচি—এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই শুরু হবে নতুন মৌসুমের আসল উত্তেজনা। এবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তাই ড্র থেকেই জমে উঠতে পারে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় লড়াই।



























