তিন মাস বন্ধ থাকার পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে সুন্দরবন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমিতে ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে ইতোমধ্যে পর্যটকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে সুন্দরবন ভ্রমণের আগে যাতায়াত, নৌযান, খরচ, অনুমতি ও বন বিভাগের নিয়ম সম্পর্কে জানা জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে ভ্রমণ যেমন নিরাপদ হবে, তেমনি উপভোগও হবে বেশি।সুন্দরবনে ভ্রমণের জন্য খুলনা, বাগেরহাটের মোংলা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরকে প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তবে লঞ্চ বা জাহাজে সুন্দরবনে যেতে হলে খুলনা ও মোংলা থেকে যাত্রা করতে হয়। ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে খুলনা ও মোংলায় যাওয়া যায়।
ঢাকা থেকে খুলনায় যাওয়ার জন্য কয়েকটি ট্রেনও চালু রয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা থেকে মোংলাগামী নন-এসি বাসের ভাড়া প্রায় ৭০০ টাকা। ভ্রমণের আগে বাস, ট্রেন ও নৌযানের সময়সূচি জেনে বুকিং করা ভালো। এতে যাত্রাপথে অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনা এড়ানো সম্ভব হবে।সুন্দরবনের সব এলাকায় ইচ্ছেমতো প্রবেশের সুযোগ নেই। বন বিভাগের অনুমতি বা বৈধ পাস নিয়ে নির্ধারিত পথ ও পর্যটন স্পটে যেতে হয়। কিছু এলাকায় প্রবেশের জন্য বিশেষ অনুমতিরও প্রয়োজন হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় অনুমতি ও নিয়ম সম্পর্কে জেনে নেওয়া জরুরি।
মোংলার পশুর নদ, খুলনার রূপসা-শিবসা নদী ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন পথ দিয়ে সুন্দরবনের পর্যটন স্পটে যাওয়া যায়। মোংলা থেকে করমজল ও হাড়বাড়িয়া, খুলনা থেকে কালাবাগী ও শেখেরটেক এবং মুন্সিগঞ্জ থেকে কলাকাছিয়া ও দোবেকীতে ট্রলার নিয়ে যাওয়া যায়। এসব এলাকায় পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের নৌযান রয়েছে। দলবদ্ধভাবে গেলে আগে থেকেই নৌযান বুকিং করা সুবিধাজনক।
ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে সুন্দরবন ভ্রমণ করলে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ফি প্যাকেজের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত থাকে। তবে নিজ উদ্যোগে এক দিনের ভ্রমণে গেলে প্রতিটি পর্যটন স্পটের জন্য আলাদাভাবে প্রবেশ ফি দিতে হয়। নৌযানের ভাড়া, খাবার ও অন্যান্য খরচও আগে থেকে জেনে নেওয়া ভালো। এতে ভ্রমণের মোট বাজেট নির্ধারণ করা সহজ হবে।মোংলা থেকে খুব সকালে রওনা দিলে এক দিনেই করমজল ও হাড়বাড়িয়া ঘুরে দেখা সম্ভব। মোংলা ফেরিঘাট থেকে সারা দিনের জন্য নৌযান ভাড়া নেওয়া যায়। শুধু করমজল যেতে নৌযানের ভাড়া সাধারণত ১-২ হাজার টাকা এবং করমজল ও হাড়বাড়িয়া দুটিতে গেলে প্রায় ৪-৫ হাজার টাকা লাগে। দুপুরের খাবার সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়াই ভালো।
খুলনার দাকোপ উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন কৈলাসগঞ্জ ও বাণীশান্তা ইউনিয়নে বেশ কিছু ইকোকটেজ গড়ে উঠেছে। অনেক পর্যটক এসব কটেজে অবস্থান করে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন। খুলনা থেকে মোংলা হয়ে কিংবা চালনা হয়ে এসব এলাকায় যাওয়া যায়। প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে সময় কাটাতে চাইলে ইকোকটেজ হতে পারে ভালো বিকল্প।বর্তমানে খুলনা থেকে সুন্দরবনে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রায় ৬৫টি জলযান রয়েছে। এসব নৌযানে ছয় থেকে সর্বোচ্চ ৭৫ জন পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারেন। সাধারণত সুন্দরবনে তিন দিন দুই রাতের ট্যুর বেশি জনপ্রিয়। উৎসব ও দীর্ঘ ছুটির সময়ে পর্যটকের চাপ বাড়ায় কয়েক মাস আগে বুকিং দেওয়া ভালো।
কোম্পানির মাধ্যমে ট্যুরে গেলে সাধারণত আগে থেকেই মোট খরচের ৫০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম দিতে হয়। নন-এসি জলযানে জনপ্রতি প্রায় ৮-১২ হাজার টাকা এবং এসি জলযানে ১৪-২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। প্যাকেজের মধ্যে অনুমতি ফি, থাকা, গাইড ও খাবারের খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে। সাধারণত সকাল, দুপুর ও রাতের খাবারের পাশাপাশি দুটি স্ন্যাকসও দেওয়া হয়।সুন্দরবন ভ্রমণে বন বিভাগের নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বনে ড্রোন ওড়ানো ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ। পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো সামগ্রী বা কার্যক্রম থেকেও বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের গ্লাস, প্লেটসহ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সামগ্রী বনে না নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
সুন্দরবন শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। তাই ভ্রমণের সময় বনের পশুপাখিকে বিরক্ত করা, শব্দদূষণ সৃষ্টি করা কিংবা পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করা যাবে না। নিজের আনন্দের পাশাপাশি সুন্দরবনের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্বও পর্যটকদের নিতে হবে।





























